ইংরেজি ‘ডিপ্লোম্যাসি’র বাংলা করা হয়েছে কূটনীতি। কূট শব্দটি বাংলা ভাষায় নেতিবাচক হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। কূট মানে হচ্ছে কুটিল (কূটবুদ্ধি); জটিল, দুর্বোধ্য (কূটপ্রশ্ন); মিথ্যা, কপট, শঠ (কূটচরিত্র); জালিয়াতি, জোচ্চুরি, কারসাজি বা ঘোরপ্যাঁচযুক্ত (কূটকচাল)। অভিধান মতে, কূটনীতি হচ্ছে কুটিল নীতি; কপটতা; কৌশলপূর্ণ রাজনীতি (প্রধানত এক রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের)। সেই দিক থেকে ‘ডিপ্লোম্যাসি’ শব্দের অর্থ হিসেবে কূটনীতি শব্দটি কিছুটা বেমানান। একজন মানুষ কূট হলেও হতে পারেন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নীতি কী করে কূট বা নেতিবাচক হয়?
কূটনীতির মানে যা-ই হোক না কেন, বর্তমান যুগ হচ্ছে কূটনীতির যুগ। সবকিছুতেই ‘কূটনীতি’ কথাটা ব্যবহার করা হয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যেমন কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা বলা হয়, আবার করোনার টিকার জন্যও যথাযথ ‘কূটনৈতিক উদ্যোগের’ কথা বলা হয়। এভাবে তেল কূটনীতি, জল কূটনীতি, সমুদ্র কূটনীতি, টিকা কূটনীতি, অভিবাসন কূটনীতি, জলবায়ু কূটনীতি, বাণিজ্য কূটনীতি, অস্ত্র কূটনীতি ইত্যাদি নানা কূটনীতির কথা শোনা যায়। বর্তমানে কূটনীতির মারপ্যাঁচে যেমন এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে ঘায়েল করছে, আবার কূটনীতির জোরে সুবিধাও আদায় করছে।
কূটনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘ডিপ্লোম্যাসি’ শব্দটি প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘ডিপ্লোন’ থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়। ‘ডিপ্লোন’ মানে হচ্ছে ভাঁজ করা। কাপড়চোপড়/ভাঁজ করে রাখার মতো রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্ককে ভাঁজ করে রাখা থেকেই এ শব্দের উত্পত্তি? হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই! কূটনীতি ব্যাপারটি অত্যন্ত পুরোনো। রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে সঙ্গে কূটনীতির ধারণাও এসেছে। প্রাচীন গ্রিসের বিভিন্ন নগররাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রয়োজনে সেই সব নগররাষ্ট্রের মধ্যে দূত বিনিময় হতো। প্রাচীন ও মধ্যযুগে ভারতেও দূত বিনিময়ের রীতি প্রচলিত ছিল। পঞ্চদশ শতক থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রে দূতাবাস স্থাপন শুরু করে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে, ফরাসিরা সরকারিভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় আলোচককে বোঝার জন্য ‘কূটনীতিক’ (কূটনৈতিক) শব্দটি ব্যবহার শুরু করে।
আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি বলতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থে সাহায্য ও সহযোগিতার সম্পর্ক বোঝায়। কূটনীতির সঙ্গে পররাষ্ট্রনীতির সম্পর্ক নিবিড়। নিজ নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নতি ও অন্যান্য প্রয়োজনে প্রতিটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক নীতি প্রণয়ন করে। কূটনীতির মাধ্যমে সেই নীতি রূপায়িত হয়।
কূটনীতি আসলে সহজ নয়। এটা অত্যন্ত জটিল একটা কাজ। ইংরেজি ভাষায় ডিপ্লোমেসি শব্দটির একটি বহু প্রচলিত সংজ্ঞা পাওয়া যায়। সংজ্ঞাটি হলো, যখন তুমি লোকজনকে বোঝাতে পারো যে, যে জিনিসটা তুমি পাবে না, সেটা তুমি মোটেই চাও না—সেই কলাকৌশলের নামই ডিপ্লোমেসি। এই সংজ্ঞার মতো কূটনীতিও আসলে খুবই জটিল একটি কাজ। এর ভাব আলাদা, ভাষা আলাদা। উদ্দেশ্যও আলাদা। ফ্রান্সে প্রচলিত একটি কথা আছে, একজন নারীর সঙ্গে একজন ডিপ্লোম্যাটের পার্থক্য কী?
যদি কোনো নারী ‘না’ বলেন, তার মানে ‘হয়তো’, তিনি যদি ‘হয়তো’ বলেন, তাহলে তার মানে হচ্ছে ‘হ্যাঁ’, আর তিনি যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে তিনি কোনো নারীই নন।
ডিপ্লোম্যাটের ব্যাপরটা ঠিক বিপরীত। কোনো ডিপ্লোম্যাট যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তার মানে ‘হয়তো’, তিনি যদি ‘হয়তো’ বলেন, তাহলে তার মানে হচ্ছে ‘না’, আর তিনি যদি ‘না’ বলেন, তাহলে তিনি কোনো ডিপ্লোম্যাটই নন।
আসলে কূটনীতি হচ্ছে একধরনের আর্ট। একসময়ে কূটনীতি বলতে কেবল একটি দেশের লাভের কথা ভাবা হতো। বর্তমানে কূটনৈতিক সম্পর্ক পারস্পরিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে পরিচালনা করা হয়। আধুনিক যুগে বৈদেশিক সম্পর্ক চাট্টিখানি বিষয় নয়। সম্রাট আকবরের সময় অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো-মন্দে বিশেষ কিছু আসত-যেত না। কিন্তু একালে আসে যায়। কূটনীতি একালে এক কঠিন বিষয়। ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্কই হোক বা বন্ধুপ্রতিম সম্পর্কই হোক, মনে করার কারণ নেই যে সবাই সব সময় ভাইয়ের মতো মমতা মাখানো বা বন্ধুর মতো অন্তরঙ্গ আচরণ করবে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে। বৈদেশিক সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর। আমি তোমাকে দেব, তুমি আমাকে দেবে। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রেম-প্রীতির ব্যাপার নয়; দেওয়া-নেওয়ার বিষয়; মর্যাদা ও স্বার্থরক্ষার বিষয়।
কূটনীতি আসলে কৌশলের খেলা। কূটনীতির ভাষাও তাই আলাদা। কূটনীতির ভাষা সাধারণ ভাষা থেকে খানিকটা ভিন্ন হয়ে থাকে, সেটা সবার জানা। আমরা অনেক সময় ‘কূটনীতির মারপ্যাঁচ’ শব্দ দুটি ব্যবহার করে থাকি। আপনি কিছুই বললেন না, নীরব থাকলেন—তাতেও কিন্তু আসল কথাটি বলা হয়ে যায়। আবার একটি বা দুটি শব্দ বললেন নিছক কৌতুকের ছলে, তাতেও কাজ হাসিল হয়ে যেতে পারে।
কূটনীতিতে কতগুলো শব্দ বহুল ব্যবহূত। বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে প্রায় সমার্থক সেই শব্দগুলো (জারগন) কূটনীতিকদের মুখস্থ। এই যেমন, বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যু, সমঝোতা, কমফোর্ট জোন, ডায়ালগ, উইন-উইন পজিশন ইত্যাদি। এ ধরনের আরো কিছু শব্দ আছে, যার মূল সুর হলো সহযোগিতা। দ্বিপাক্ষিক হোক বা বহুপাক্ষিক, দ্বিরাষ্ট্রীয় হোক বা বহুরাষ্ট্রীয় অথবা জোটকেন্দ্রিক; কূটনীতি শুরু হয় সহযোগিতার নাম নিয়েই।
সহযোগিতার ইস্যু ছাড়াও কূটনীতিতে আরেকটি শব্দের বেশ কদর—‘বন্ধুত্ব’! মোটামুটি সব দেশের কূটনৈতিক পরিভাষায় এই শব্দটির গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও ব্যবহার রয়েছে। কূটনৈতিক নীতিমালার বাইবেল হিসেবে পরিচিত ভিয়েনা কনভেনশনেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই বন্ধুত্বের কথাই বারবার বলা হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক তো বটেই আঞ্চলিক জোটগুলোও বেশ কায়দা করে এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।
ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী চার্চিল একসময় মন্তব্য করেছিলেন, ‘কূটনীতি হলো এমন একটা আর্ট যে, তুমি কাউকে জাহান্নামে যাও বলবে এমনভাবে, যেন সে তোমার কাছে এসে সেখানে যাওয়ার ঠিকানা খোঁজ করে।’ আর আড়াই হাজার বছর আগে চীনা সমর বিশেষজ্ঞ সান জু পরামর্শ দিয়েছিলেন, যুদ্ধের সর্বোত্তম পথ হলো, একটা গুলি খরচ না করেও শত্রুকে ঘায়েল করা।
আমাদের কূটনীতি যদিও সেই পর্যায়ে উপনীত হতে পারেনি। আমরা এখন পর্যন্ত বন্ধুত্ব, সহযোগিতা, অভিন্ন স্বার্থ, শান্তি, কল্যাণ ইত্যাদি শব্দ নিয়েই নাড়াচাড়া করি।
পরিশেষে একটা গল্প। এটা ঠিক সরাসরি কূটনীতি-সম্পর্কিত নয়। তবে এই গল্পের মধ্যে যে কূটনীতির কিছুই নেই—এমনটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না!
একদিন এক জাহাজে চার জন ব্যক্তি যাচ্ছিলেন। এদের একজন আমেরিকা, একজন রাশিয়া, একজন কাতার এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে আমেরিকান নাগরিক তার আইফোনটি পানিতে ফেলে দিলেন। এই দেখে অন্যরা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘হায়, হায়! এত দামি ফোনটা পানিতে ফেলে দিলেন?’
আমেরিকান নাগরিকটি হেসে বলল : আরে ধুত্, এটা কোনো ব্যাপার হলো? এগুলো আমাদের দেশে অনেক আছে।
এরপর রাশিয়ান ভদ্রলোক ব্যাগ থেকে একটি আনট্যাগ ভোদকার বোতল বের করে সেটা পানিতে ফেলে দিল। এই দৃশ্য দেখে যথারীতি সবাই বিস্মিত হয়ে বলল, আহা, কী করলেন? এমন দামি জিনিস না খেয়ে ফেলে দিলেন?
রাশিয়ান ভদ্রলোক মুচকি হেসে বলল, এ জিনিস আমাদের দেশে অনেক আছে।
একটু পরে কাতারের নাগরিকটি কয়েক বান্ডেল রিয়াল(কাতারের টাকা) পানিতে ফেলে দিলেন। সবাই চোখ কপালে তুলে বলল, এটা কী করলেন? এতগুলো টাকা পানিতে ফেলে দিলেন?
কাতারের ভদ্রলোকও গর্বিত ভঙ্গিতে বলল, এগুলো আমাদের দেশে অনেক আছে।
এরপর বাংলাদেশের ভদ্রলোক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাচ্চাকে টেনে পানিতে ফেলে দিলেন!
এই দেখে বাকিরা হায় হায় করে উঠল, চিত্কার করে বলল, কী সর্বনেশে ব্যপার, বাচ্চাটাকে পানিতে ফেলে দিলেন?
বাংলাদেশি লোকটি পাত্তা না দিয়ে বলল, ধ্যাত্, এটা কোনো ব্যাপার হলো? এগুলো আমাদের দেশে অনেক আছে!
এরপর জাহাজ থেকে নেমে বাংলাদেশি লোকটি নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছে। এমন সময় পানি থেকে বাচ্চাটি উঠে এসে বলল, আব্বা, টাকাগুলো পেয়েছি, কিন্তু ফোন আর বোতলটা তলিয়ে গেছে, তাই তুলতে পারিনি!
n লেখক: রম্যরচয়িতা

