এ যেন এক অচেনা শিক্ষাব্যবস্থা। হয়নি স্কুলে যাওয়া, সারা বছর কোনো ধরনের পরীক্ষায়ও বসতে হয়নি। কিন্তু শিক্ষার্থীরা পাশ করেছে। প্রমোশনও পেয়েছে। শিক্ষকরাও ছিলেন ঘরবন্দি। শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য অনলাইনে চালুর চেষ্টা করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যদিও এই কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি অধিকাংশ শিক্ষার্থী। এ কারণে এই কার্যক্রমকে ‘যা মন্দের ভালো’ হিসাবে বিবেচনা করছেন অভিভাবক ও শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। এর পরও যে খুলবে সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। ফলে আরো কয়েক মাস নতুন শিক্ষাবর্ষের যাত্রা থেমে থাকতে পারে। বছরের শুরুতে নতুন বই নিয়ে স্কুলে যাওয়ার যে চিরায়ত ঐতিহ্য সেটিও হারিয়ে গেছে করোনায়।
বছর জুড়ে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান :করোনা শুরুর পরপরই সচেতন মহলের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। বেশ কয়েক বার বাড়িয়ে আগামী বছরের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু স্কুলে যেতেই বারণ করা হয়নি, ঘরের বাইরেও বের না হতে নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বাতিল করা হয় গুরুত্বপূর্ণ সব পরীক্ষা :২ এপ্রিল থেকে শুরু হবার সিদ্ধান্ত ছিল এইচএসসি পরীক্ষা। কিন্তু ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে এই পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। করোনার শুরুর দিকে পরীক্ষা নেওয়া হবে এমন ঘোষণা দেওয়া হলে পরে বাতিল করা হয় গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষা। জেএসসি ও এসএসসি—এই দুই পরীক্ষার ফল নিয়ে এইচএসসির ফল ঘোষণা দেওয়া হবে এমন সিদ্ধান্ত আসে। পরে একে একে বাতিল হতে থাকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি)ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট পরীক্ষা (জেডিসি) এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাও। শুধু তাই নয়, বাতিল করা হয় প্রথম থেকে শুরু করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব বার্ষিক পরীক্ষাও। ফলে অটো পাশ। অর্থাত্ কোনো পরীক্ষা ছাড়াও সব শিক্ষার্থী পাশ হবে এবং পরের শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হবে।
ঝরে পড়ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী :করোনা ভাইরাস মহামারির পরে প্রায় বিশ্বের ১ কোটি শিশু আর স্কুলে ফিরবে না। সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশে স্কুল বন্ধ রয়েছে। এতে বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে। গরিব শিশুদের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর স্কুল খুলে দিলেও লাখ লাখ শিশু আর শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারবে না।
চালু ছিল অনলাইন শিক্ষা :করোনায় থেমে যাওয়া শিক্ষা কার্যক্রম কিছুটা হলেও চালিয়ে নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ছিল অনলাইনে ও রেডিও এবং টেলিভিশনের মাধ্যমে পাঠদান। কমসংখ্যক শিক্ষার্থী এই মাধ্যমে সুযোগ পেয়েছে। এ কারণে করোনাকালেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক বৈষম্য তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রাম-শহর ও ধনী-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। শহরের শিক্ষার্থীরা টেলিভিশনের ক্লাস না দেখলেও অনলাইনে কিছুটা নিয়মিত ছিল। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীরা পুরোপুরিই পড়ালেখার বাইরে রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বা অভিভাবকের টেলিভিশন, স্মার্ট ফোন বা অনলাইন ক্লাসের জন্য অন্য কোনো ডিভাইসই নেই। অনলাইনে ক্লাস নিয়ে তারা কোনো ধরনের ধারণাও পায়নি। শেষ পর্যন্ত নতুন কর্মসূচি নিয়ে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম চালু রাখা হয়।
আলোচনায় টিউশন ফি :করোনায় বছর জুড়ে আলোচনায় ছিল টিউশন ফির বিষয়টি। এই ফি নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের মধ্যে ছিল বিরোধ। মানববন্ধন, বিক্ষোভের মতো একাধিক কর্মসূচিও পালন করেছেন অভিভাবকরা। অভিভাবকদের অভিযোগ ছিল, স্কুল বন্ধ ছিল, সন্তানরা শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে থাকলেও টিউশন ফির চাপে বিপাকে ছিলের তারা। স্কুল থেকে লেখাপড়ার বিষয়ে খোঁজখবর না নিলেও টিউশন ফি আদায়ে নিয়মিত তাগাদা আসছে। পুরো টিউশন এবং পরীক্ষার ফি পরিশোধ না করলে পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তি করবে না এমন আশঙ্কার কথা জানাচ্ছে অভিভাবকরা। স্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে টিউশন ফি না দেওয়ায় স্কুলের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। সবশেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি নীতিমালা করে দেওয়া হয়, যাতে বলা হয় টিউশন ফি ছাড়া অন্য কোনো ফি আদায় করা যাবে না। সরকারের এ সিদ্ধান্তে একমত নন অভিভাবকরা। তবে অভিভাবকদের জন্য শঙ্কার খবর হলো, পুরো বছরের টিউশন ফি পরিশোধ করতে হবে।
বন্ধ হয়ে গেছে ১০ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন :অক্টোবর-নভেম্বরে কিন্ডারগার্টেনে শিশু ভর্তির জন্য লাইন পড়ে যায়। করোনার এই দুঃসময়ে চিত্র ঠিক পালটে গেছে। ভর্তি মৌসুমে ছিল না তোড়জোড়। নতুনরা তো আসছেই না। এছাড়া খুঁজে পাচ্ছে না তাদের পুরোনো শিক্ষার্থীও। এমনকি টিউশন ফি পরিশোধের ভয়ে যোগাযোগ রাখছেন না আগের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ফলে বছর শেষ হতে চললেও দুরবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন মালিকরা বলছেন, ১ লাখ কিন্ডারগার্টেনের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার কিন্ডারগার্টেন বন্ধ হয়ে গেছে। যাদের নিজেদের পুঁজি ছিল, তারা তা ভেঙে কোনোরকমে টিকিয়ে রেখেছে। এখন ডিসেম্বর মাস চলছে; কিন্তু শিক্ষার্থীর দেখা মিলছে না। কেউ ভর্তির তথ্য জানতেও আসছে না।
বেতন পাননি অনেক শিক্ষক :করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন অনেক শিক্ষক। আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকই নিয়মিত বেতন-ভাতা পাননি। এ কারণে নানা সংকট ও শঙ্কায় আছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। শুধু স্কুল বা কলেজ নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও একই। শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি পরিশোধ করছে না এই অজুহাতে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেখানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো বেতন-ভাতাই দিচ্ছেন না। আবার কেউ অর্ধেক বা কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এক-তৃতীয়াংশ বেতন-ভাতা পরিশোধ করছেন।
