চলতি বছর কোভিড-১৯ মহামারিতে আইন ও বিচারাঙ্গনে ঘটেছে নানা ঘটনা। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান এনে আইন সংস্কারের পাশাপাশি দেশে প্রথমবারের মতো ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শুরু হয়েছে বিচারকাজ। পাশাপাশি শারীরিক উপস্থিতিতেও বিচারকাজ চলছে। বিভিন্ন মামলায় যুগান্তকারী নানা রায় ও উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ বিচারপ্রার্থীর মনে আশার সঞ্চার করেছে। দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে সরব ছিল দেশের উচ্চ আদালত। হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচারের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশের বার্তা এসেছে সেখান থেকে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেছে আদালত। দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন সাজার মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যুগান্তকারী ঐ রায়ে বলা হয়েছে, যাবজ্জীবন মানে ৩০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। তবে কোনো মামলায় আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলে স্বাভাবিক মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হবে। এর আগে মুক্তির সুযোগ নেই।
মার্চ মাসে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়ার পর দেশে লকডাউন আরোপ করা হয়। এই লকডাউনে দেশের সর্বোচ্চ ও নিম্ন আদালত বন্ধ রাখা হয়। দীর্ঘ পাঁচ মাস পরে আদালতে বিচারকাজ শুরু হয়। তথ্যপ্রযুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে চালু করা হয় এই ভার্চুয়াল আদালত। শুরুতে এই ভার্চুয়াল আদালতে মামলা পরিচালনা নিয়ে আইনজীবীদের মতবিরোধ ছিল। কিন্তু সেই মতবিরোধ ভুলে এখন স্বাচ্ছন্দ্যেই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচারকাজে অংশ নিচ্ছেন আইনজীবীরা। ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে বিচারকাজ চলায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও দেশের বাইরে অবস্থানকালেও আইনজীবীরা মামলার শুনানিতে অংশ নিতে পারছেন, যা বিচারব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি নারী ও শিশুরা। অনেক স্থানে তারা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তেমনি একটি ঘটনা ছিল সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে এক নারীর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক নারীকে বিবস্ত্র করে নির্মম নির্যাতনের ঘটনাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ঘটনায় দেশ জুড়ে প্রতিবাদে সরব হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তারা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার গত ১৩ অক্টোবর বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনে। ঐ সংশোধনীতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। এর আগে ধর্ষণের শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন দণ্ড।
তবে এই আদেশের সমালোচনা করেছে নারীবাদী সংগঠনগুলো। এই সমালোচনার জবাব দিয়ে হাইকোর্ট বলেছে, ‘যে যাই সমালোচনা করুক, আমরা এ ধরনের বিয়ের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছি।’
চলতি বছর বেশ কিছু ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত শেষ করেছেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকেরা। দেশের কয়েকটি ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাত্র তিন কার্যদিবসে শেষ করেছেন ধর্ষণ মামলা। এ ধরনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে আশার সঞ্চার হয়েছে বিচারপ্রার্থীদের মনে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারকেরা যদি প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা রাখেন, তাহলে ধর্ষণ মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা সম্ভব। তবে শুধু বিচারক নন, তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
জামিন সংকুচিত হয়েছে দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মামলায়। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়ে । আদালত বলেছে, দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে জড়িতরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে, সমস্ত জাতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাবে, এটা হতে পারে না। দেশটা কি মগের মল্লুক? অবশ্যই অর্থ পাচারকারীদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিচার বিভাগ নিয়ে বিরূপ স্ট্যাটাস দেওয়ায় আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দকে তিন মাসের জন্য আইন পেশা থেকে বিরত রাখা হয়।
