‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২০, ২১:২১

দুই হাজার বিশ সালের অবয়বটি বেশ দৃষ্টিনন্দন ছিল। গত বত্সর এই দিনে কেহ কি জানিত—কী এক বিষম যাতনাকাল অপেক্ষা করিতেছে এই বিশ্বের জন্য? করোনা লইয়া সমগ্র বিশ্ব যখন ত্যক্তবিরক্ত, জীবিকার মাধ্যমে জীবন বাঁচাইতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি যখন একে-একে সকল আর্গল খুলিয়া দিতেছিল, তখন ব্রিটেনের করোনার নূতন স্ট্রেন লইয়া সারা বিশ্ব পুনরায় নড়িয়াচড়িয়া বসিল। তবে করোনাকে পূর্বের মতো কলকে দিতে অনেক বিশেষজ্ঞই রাজি নহেন। করোনা কতখানি ভয়ংকর, তাহার চাইতেও বড় প্রশ্ন, করোনার কারণে সৃষ্ট লকডাউন ও বিবিধ বিধিনিষেধে বিশ্বের অর্থনীতি কতখানি ক্ষতির শিকার হইল। এই ক্ষেত্রে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত ‘এশিয়া প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক ২০২০’-এর  প্রতিবেদনটি বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলিতে করোনা মহামারির প্রভাবে নূতন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা অনেকটাই ভাঙিয়া পড়িয়াছে। চাকুরিতে যাহারা ছিলেন, এমন লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মঘণ্টা কমিয়াছে, আবার অনেকে সম্পূর্ণ বেকার হইয়াছেন। প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, করোনা মহামারি অব্যাহত থাকিবার কারণে এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে আরো ২ কোটি ২০ লক্ষ হইতে আড়াই কোটি মানুষ উপার্জন হ্রাসের কারণে দারিদ্র্যে পড়িবে।

অর্থাত্ নূতন বত্সরে এই বিশ্ব কোভিডের অর্থদংশনের ভিতর দিয়াই প্রবেশ করিতে যাইতেছে। নূতন আশার আলো অবশ্য বিজ্ঞান দেখাইয়াছে। করোনার মহামারি যদি আজি হইতে সহস্র বত্সর পূর্বে হইত, তাহা হইলে আমরা তখন বুঝিতেও পারিতাম না—কেন কী কারণে জনে-জনে এইভাবে অসুস্থ হইতেছে। যদিও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার তুলনায় চিকিত্সাবিজ্ঞান এখনো পিছাইয়া রহিয়াছে। তাহার পরও আমরা দেখিয়াছি, সারা বিশ্বই এই মহামারির সময় বিজ্ঞান ও প্রাযুক্তিক জ্ঞানকে কাজে লাগাইয়াছে দারুণভাবে। অর্থাত্ যখন চারিদিকে মহামারির কৃষ্ণছায়া তাড়া করিয়াছে, তখন বিজ্ঞান তাহার পিদিম হাতে আমাদের পথ দেখাইয়াছে। দাবি করা হইতেছে, সবচাইতে স্বল্পসময়ের মধ্যে করোনার একাধিক ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা হইয়াছে। যদিও ভ্যাকসিন লইয়া বিবিধ রাজনীতি রহিয়াছে। বিশ্ব আর পূর্বের মতো সহজ নহে। এমনকি করোনা ভ্যাকসিনের একটি বিশাল অর্থনৈতিক বাজারও তৈরি হইয়াছে। অনেকের মতে, তৈরি করা হইয়াছে। তবে এই সকল বিষয় লইয়া তর্কবিতর্ক থাকিলেও একমাত্র বিজ্ঞানই যে আমাদের আঁধার ঘরের আলো জ্বালাইতে পারে, এই মহামারি তাহা পুনরায় বুঝাইয়া দিয়া গেল। 

প্রতিটি বিপর্যয়ই নূতন সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। করোনার ক্ষেত্রেও তাহা সত্য। বিশ্বরাজনীতি লইয়া অনেক কিছু বলিবার আছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রসঙ্গে দীর্ঘ নিবন্ধ হইতে পারে। যদিও ট্রাম্প এখনো পরাজয় স্বীকার করেন নাই। এবং সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ভোটের ফল এখন ওয়াশিংটন ডিসিতে পাঠানো হইবে এবং কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে আগামী ৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক গণনা হইবে। ইহাই আগামী ২০ জানুয়ারি বাইডেনের প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার পথ তৈরি করিবে। এইদিকে, ২০২০ সালটি যদি সারা বিশ্বের জন্য করোনা ভাইরাসের হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এই বত্সরটি ছিল ইসরাইলের। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত আগস্টে ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঘোষণা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ইহাকে অনেকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের একটি ভূরাজনৈতিক ভূমিকম্প’ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। প্রসঙ্গত, ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ার পর বাহরাইন ও আরব আমিরাত তৃতীয় ও চতুর্থ উপসাগরীয় দেশ হিসাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিল। ইহা পূর্বে মিশর ১৯৭৯ সালে এবং জর্ডান ১৯৯৪ সালে ইসরাইলের সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছিল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক অর্জন হইল—ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কার ভিতরেও বাংলাদেশ অত্যন্ত চৌকশভাবে ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে। আমরা আশা করিব, সকল জঞ্জাল ও পঙ্ক দূর করিয়া ২০২১ আমাদের এক স্বাভাবিক ও অপার সম্ভাবনার জীবনের সন্ধান দিবে। জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক। বিদায় ২০২০।