বিচার বিলম্বে দায়ী ব্যক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২১, ২০:০৪

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়েরকৃত মামলার বিচার বিলম্বের জন্য দায়ী কে সে বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ট্রাইব্যুনালের বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও পুলিশ কর্মকর্তাকে নিজ নিজ কর্তৃপক্ষের কাছে ঐ প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ঐ বিধান প্রতিপালনের জন্য চার বছর পর দ্বিতীয়বারের মত এই সার্কুলার জারি করল সুপ্রিম কোর্ট।

সার্কুলার অনুযায়ী ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যার ঘটনায় করা মামলার বিচার বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তি কে সেই বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারককে সুপ্রিম কোর্টে এবং পিপিকে আইন মন্ত্রণালয়ে এবং পুলিশ কর্মকর্তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। ঐ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যাতে দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয় সেটাই এই সার্কুলারের মুখ্য উদ্দেশ্য বলে জানা গেছে।  

গত বছরে দেশে ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, শুধু শাস্তি বৃদ্ধি করে এ ধরনের গুরুতর অপরাধ দমন করা যাবে না। এজন্য দরকার আইনের যথাযথ প্রয়োগ। সেই প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এই সার্কুলার জারি করা হলো। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী ও শিশুর উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার বিচার সম্পন্নের জন্য সময়সীমা বেধে দেওয়া হয়েছে আইনে। ঐ সময়ের মধ্যে বিচার শেষ করতে না পারলে এর জন্য কারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা ঐ আইনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বিচার বিলম্বে জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য কখনো জানা যায় না। ফলে কার্যকরভাবে আইনের প্রয়োগ ঘটে না। 

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়েরকৃত মামলার বিচার ১৮০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। ঐ আইনের ২০(৩) ধারায় বলা হয়েছে, বিচারের জন্য মামলা প্রাপ্তির তারিখ হতে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল বিচার কাজ সমাপ্ত করবে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে বিচার কাজ সমাপ্ত না হলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক, পিপি ও মামলার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের নিকট প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে। বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৩১(ক)(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোন মামলা ধারা ২০ এর উপ-ধারা (৩) এ উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি না হওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালকে এর কারণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রতিবেদন ত্রিশ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের নিকট দাখিল করতে হবে। যার একটি অনুলিপি সরকারের নিকট প্রেরণ করতে হবে। (২) অনুরূপ ক্ষেত্রে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকেও এর কারণ লিপিবদ্ধ করে একটি প্রতিবেদন ত্রিশ দিনের মধ্যে সরকারের নিকট দাখিল করতে হবে, যার একটি অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ করতে হবে। (৩) উপ-ধারা (১) বা (২) এর অধীন পেশকৃত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার জন্য দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। 

আইনের এই বিধান প্রতিপালন না করার বিষয়টি ‘মো. মিলাদ হোসেন বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ে উঠে এসেছে। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চের ২০১৬ সালে দেওয়া রায়ে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৩১(ক) ধারার নির্দেশনা কখনো প্রতিপালন করা হয় না। যা অনাকাঙ্ক্ষিত, আইনের গুরুতর লঙ্ঘন ও ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। হাইকোর্টের এই রায়ের পর ঐ বছরই বিদ্যমান আইনের বিধান প্রতিপালনে সার্কুলার জারি করা হয়। কিন্তু ঐ সার্কুলার অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট, আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিচারক, পিপি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন পাঠাতে তেমন কোন তৎপরতা না থাকায় গত ২৭ ডিসেম্বর পুনরায় সার্কুলার জারি করল সুপ্রিম কোর্ট। 

সার্কুলারে যা বলা হয়েছে: 
সুপ্রিম কোর্টের গোচরীভ‚ত হয়েছে যে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩১ক ধারা আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করার জন্য ২০১৬ সালে সার্কুলার জারি করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল থেকে আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণ লিপিবদ্ধ করে বিচারকরা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ করা হচ্ছে না। উক্ত বিষয়ে পিপি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাগণও এর কারণ লিপিবদ্ধ করে এক মাসের মধ্যে সরকারের নিকট প্রতিবেদন দাখিল করে তা সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিতভাবে প্রেরণ করছেন না। এমতাবস্থায় ৩১ক ধারার বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে পুনরায় নির্দেশ প্রদান করা হলো। 

ইত্তেফাক/এমএএম