প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ড :নিরাপত্তায় ন্যূনতম ব্যয়!

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০৫

 ‘নিরাপত্তা’ বিবেচনায় মানুষ তার জীবন ও সম্পদ রক্ষায় সর্বদাই চিন্তিত; তাই নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তালা-চাবি, সুউচ্চ প্রাচীর, দুর্ভেদ্য বেষ্টনী, আধুনিক সিসি ক্যামেরাসহ উন্নত সব প্রযুক্তি ব্যবহার করে। তবে এত কিছুর পরেও নিরাপত্তার জন্য গার্ড বা প্রহরীর বিকল্প নেই। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্ব সরাসরি পালন করে না, বিভিন্ন স্তরে বা পর্যায়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার জন্য নিজেরাই প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি বা বেসরকারি নিরাপত্তা সেবাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রহরী নিয়োগ করে। দেশে সর্বপ্রথম প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশে আট শতাধিক প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে এবং তাদের অধীনে প্রায় ৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হয়।

প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি পরিচালনার জন্য সরকার ‘বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন, ২০০৬’ এবং ‘বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা বিধিমালা, ২০০৭’ প্রণয়ন করে। তবে এই আইন বা বিধিমালার কিছু ধারার সঙ্গে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের মতপার্থক্য থাকায় তা আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে আইনটি এখনো কার্যকর হয়নি। এছাড়া প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিসকে ২০১৩ সালে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয় এবং ২০১৮ সালে প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস সেক্টরকে ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের ৪০তম শিল্প খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহণ নীতিমালা, ২০১৮’ অনুযায়ী, সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্রে সিকিউরিটি গার্ডদের সেবা ক্যাটাগরি-৫-এ অন্তর্ভূক্ত করা হয়। প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানি চালু করতে লাইসেন্স গ্রহণসহ নিবন্ধিত কোম্পানি হিসেবে ব্যবসার নীতিমালা অনুযায়ী জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত হতে হয়; যাবতীয় হালনাগাদ ভ্যাট, আয়কর ও অগ্রিম আয়কর প্রদান করতে হয়। প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ড বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে অফিস, ব্যাংক, এটিএম বুথ, শপিংমল, অ্যাপার্টমেন্ট, পার্কিং, হাসপাতাল, নির্মাণাধীন প্রকল্প, মিলকারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, রোগীর সেবা, বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, বডিগার্ড, ব্যাংকের ভল্ট পাহারা এবং বিভিন্ন শাখায় গানম্যান, ব্যক্তির নিরাপত্তা, দূতাবাসের নিরাপত্তা ও বিদেশিদের বাড়ি পাহারা, গার্মেন্টস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঔষধ কোম্পানি, এনজিও, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার বিভিন্ন স্থাপনা ইত্যাদির নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। দেশের বড় প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো ক্যাশ ক্যারিং বা নগদ অর্থ বহনে নিরাপত্তা ও ডিজিটাল নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করে। অনেক সিকিউরিটি কোম্পানি কনসালটেন্সি সেবা ও প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন সার্ভিস দিয়ে থাকে। তাছাড়া ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক কাজে অথবা বেসরকারি পর্যায়ে দেশে আগত বিদেশিদের অনুরোধে তাদের নিরাপত্তার জন্য আর্মস গার্ড নিয়োগ দেয়। প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির আর্মস গার্ড নিয়োগের বিধান না থাকলেও নিজস্ব নিয়োগকৃত গার্ড বা সুপারভাইজারদের মধ্যে যাদের ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স ও অস্ত্র আছে, তাদের মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করা হয়। এছাড়া আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় এলিট ফোর্সের মতো প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানির রয়েছে ডগ স্কোয়াড, যা অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে ব্যবহূত হয়।

সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিকিউরিটি গার্ডদের জন্য রয়েছে নির্ধারিত কর্মঘণ্টা। শ্রম আইনের ২০১ ধারা অনুযায়ী সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা, বিশেষ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ ঘণ্টার বেশি কাউকে ডিউটি করানো যাবে না। কিন্তু গ্রাহক কর্তৃক সাধারণত প্রয়োজনের তুলনায় কমসংখ্যক সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ করে, ফলে দৈনিক ৮ ঘণ্টা ডিউটির পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ডিউটি করতে হয়। অথচ এদের মাসিক বেতন মাত্র ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, নেই তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা। শ্রম বিধিমালা, ২০১৮-এর আলোকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন-২০১৯ অনুযায়ী ‘জুনিয়র সিকিউরিটি গার্ড’ এবং ‘সিনিয়র সিকিউরিটি গার্ডদের’ জন্য যথাক্রমে ৮ হাজার ৩৭৫ ও ১১ হাজার ৩০০ টাকা নিম্নতম মাসিক বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী গার্ডদের মাসিক বেতন ১৭ হাজার ৬১০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও গ্রাহকেরা এই পরিমাণ বেতন দিতে চান না। অথচ যারা জীবন ও সম্পদ রক্ষা করছে, তাদের এত কম বেতন দিলে তাদের কাছে রক্ষিত সম্পদের মায়া স্বভাবতই কম হয়। তাছাড়া একদিকে এদের বেতন কম, অন্যদিকে তাও আবার নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না। ছুটির সুযোগ কম, নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ছুটির সমন্বয় করেন। একনাগাড়ে ৮ ঘণ্টার বেশি ডিউটি পালন করলে তাতে শিথিলতা আসে, জানমালের নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই এক জন গার্ডকে দিয়ে দুই জনের ডিউটি করানো উচিত নয়। নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রহরী নিয়োগ এবং তাদের যৌক্তিক বেতন ও বিশ্রাম নিশ্চিত করে তাদের পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অধিকাংশ প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ডরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এসে এই পেশায় যোগদান করে, মাস শেষে সামান্য বেতন দিয়ে তাদের জীবন চলে। এর ওপর ডিউটিতে সামান্য ভুলত্রুটি হলে গ্রাহকেরা বা নিয়োগকারীরা তাদের বেতন কর্তন করে, গার্ড সরবরাহকারী কোম্পানির প্রাপ্য থেকেও বড় অঙ্কের টাকা কেটে রাখে। আবার এই সামান্য বেতন দিয়ে গ্রাহকের প্রত্যাশারও কমতি নেই, তারা প্রাইভেট সিকিউরিটি গার্ডদের কাছ থেকে সেনাসদস্যদের মতো সুপ্রশিক্ষিত, টার্নআউট, স্মার্টনেস ও দক্ষতা প্রত্যাশা করে।

বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা প্রদানকারী কোম্পানিগুলো নিজ পুঁজিতে এই ব্যবসা পরিচালনা করে। এই ব্যবসায় লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য। তার ওপর এক-তৃতীয়াংশ গ্রাহক নিয়মিত সার্ভিস চার্জ বা বেতন পরিশোধ করে না। গার্ডদের কম বেতন, অতিরিক্ত ডিউটি, অনিশ্চিত চাকরি, অনেক কোম্পানির ভবিষ্য তহবিল নেই, সামাজিক মর্যাদা-কর্মঘণ্টা-বেতন এই তিনের কোনোটিই আকর্ষণীয় নয়। যে কারণে গার্ডরা দীর্ঘদিন এই চাকরিতে থাকে না, তাই ঘন ঘন গার্ড পরিবর্তন করতে হয়, নতুন নিয়োগ দিতে হয়। এতে করে গ্রাহকের সন্তুষ্টি লাভ করাও অত্যন্ত কঠিন হয়। তদুপরি প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। উন্নত দেশের মতো প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে নিজ নিজ কর্মী বাহিনীকে উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান, নির্ভরযোগ্য সেবা এবং ভালো বেতনের ব্যবস্থা করতে পারবে। তাছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে প্রাইভেট সিকিউরিটি কোম্পানিগুলোর সমন্বয়ে একটি কার্যকর সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করলে দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা আরো বেশি সুরক্ষিত হবে।

n লেখক :উপ-মহাপরিচালক (বিডি-৭), সেনাকল্যাণ সংস্থা (সেনাকল্যাণ সিকিউরিটি সার্ভিস)।