ষড়ঋতুর বাংলাদেশে শীতের আগমন ঘটে পঞ্চম ঋতুতে। কুয়াশার চাদর মুড়িয়ে বাংলাদেশে পদার্পণ ঘটে এই ঋতুর। শীতকাল মানেই একেক জনের কল্পনায় একেক চিত্র। কেউ শীতের সকালের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করেন, কেউ বা গরম কাপড় দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে রাখাকে উপভোগ করেন। আমাদের দেশে শীত মানেই পিঠাপুলির উত্সব, বাড়িতে বাড়িতে শুরু হয়ে যায় হরেক রকম পিঠা তৈরির প্রতিযোগিতা। নতুন আমেজে ভরে যায় চারপাশ। কিন্তু এই শীতকালই আবার অনেকের জন্য বয়ে আনে অসীম দুর্ভোগ। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে শীতকাল হয়ে ওঠে আতঙ্কের নাম।
জাহানারা বেগম একজন গৃহকর্মী। কাজ করেন ঢাকা শহরের একটি এলাকায়। এক ছেলে নিয়ে একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বামীহারা জাহানারার সংসার। শীতের হিমেল হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার জীবনেও নেমে আসে অসহনীয় দুর্দশা। প্রচণ্ড শীতে যখন কাঁপছে দেশ, ঠিক তখনই মাটিতে মাদুর পেতে দুটি মাত্র কাঁথায় শীত নিবারণের প্রবল চেষ্টা তার। যেখানে সমাজের বিত্তশীল বা মধ্যবিত্তরা শীত নিবারণে ব্যবহার করছে প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সৌখিন বস্ত্রসহ নানান প্রসাধনী, ঠিক সেখানেই সৌখিনতা তো দূরের কথা, হাড় কাঁপানো শীত থেকে বাঁচতে যা দরকার সেসবও মিলছে না সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের।
শুধু একজন জাহানারা বেগম নন, আমাদের সমাজে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাতসহ বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণভাবে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে অনেক মানুষ। অনেক সময় দেখা যায় গায়ে পলিথিন জড়িয়ে রাস্তার পাশে ঘুমাতে। সমাজে উচ্চবিত্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পথে ঘুমানো মানুষের সংখ্যাও।
বছরের অন্যান্য সময়ে কোনোভাবে জীবন ধারণ করলেও শীতকাল হয়ে দাঁড়ায় তাদের জন্য কঠিনতর। এমনিতেই শীতের সময় জ্বর, ঠান্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া, এলার্জি, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত নানান রোগে আক্রান্ত হয় বেশি পরিমাণে। আর এ বছরের শীতকালটা যেন অন্যান্য সময়ের তুলনায় আরো কঠিন। কেননা, করোনার থাবায় পৃথিবীর অসুস্থতায় সারা বিশ্বে তৈরি হয়েছে স্থবিরতা। শীতকালে এর দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও সচেতনতার অংশ হিসেবে; ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস’, ঘন ঘন হাত ধোয়া, মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিত করা, জনসমাগম এরিয়ে চলাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও ছিন্নমূল এসব মানুষের জন্য নেই তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা। সতর্কতার অংশ হিসেবে নেওয়া পদক্ষেপের ধাপগুলোর কোনোটাই খোলা আকাশের নিচে বসবাস করা লোকদের পক্ষে নিজ উদ্যোগে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে সমাজের সচেতন মানুষদের রাখতে হবে কান্ডারির ভূমিকা।
প্রচণ্ড এই শীত মোকাবিলায় উষ্ণতা ছড়াতে পারে মনবতার হাত। বিভিন্ন ধরনের শীতবস্ত্র বিতরণ, ত্রাণসহায়তা প্রদান, করোনা মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তা দিয়ে দেশের অবহেলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শীতকালকে একটু স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে সমাজেরই স্বাবলম্বী মানুষ। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের বিবেকবোধ জাগ্রত হওয়া।
আমাদের সমাজেরই অংশ ছিন্নমূল এসব মানুষের সহায়তা হিসেবে সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই নগণ্য। এছাড়া ত্রাণ সহায়তা বণ্টন নিয়েও রয়েছে বিভিন্ন বিতর্ক। বেসরকারি সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সরকারিভাবেও অংশ নিতে হবে এই সংকট মোকাবিলায়।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে মৌলিক চাহিদা পূরণের অধিকার। কিন্তু ঘরহীন এসব মানুষ নাগরিক সব অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে সমাজে প্রতিটি সচেতন মানুষকে কাজ করতে হবে নিজ নিজ জায়গা থেকে। তবেই তারা ফিরে পাবে কাঙ্ক্ষিত মৌলিক অধিকার। খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে হবে না কাউকে। জাহানারা বেগমরা ঘুমাবে না মাটিতে। এই শীতকাল থেকেই শুরু হোক পরিবর্তনের ধারা। সমাজের মানুষের ভেতরে উদারতা জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমে শীতে উষ্ণতা ছড়িয়ে দিক মানবতা।
n লেখক, শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
