সরকারি হাসপাতালের এ কী হাল!

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:১৮

সরকারি হাসপাতালগুলোতে ঢুকলে মনে হয় হাসপাতাল নয় কোনো বস্তিতে ঢুকেছি। একটি ছোট কেবিনের মধ্যে ১০-১৫ রোগী এবং ১০-১৫ জন আত্মীয়-স্বজনের অবস্থান দেখে তাই মনে হওয়ার কথা। শুধু এক কেবিনে ৩০-৩২ জনের অবস্থান নয়, অনেকের জায়গা হয় হাসপাতালের মেঝেতে অথবা বারান্দায়। আমি আমার দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই কথাগুলো বলছি, আপনি সরকারি যে-কোন মেডিক্যালে গেলেই বুঝতে পারবেন রোগীরা কতটুকু অসহায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে। আপনি দেখতে পারবেন কিভাবে অসহায় অবস্থায় অসুস্থ রোগীরা হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে কাতরাচ্ছে। আপনি আরো দেখতে পারবেন কিভাবে নোংরা পরিবেশে চিকিত্সা নিতে হয়। হাসপাতালের অন্দরমহল যে কতটা নোংরা, অপরিচ্ছন্ন, পূতিগন্ধময় তা হাসপাতালের রন্ধনশালায় ঢুকলেই দেখতে পাওয়া যায়। পচা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হাসপাতালের রোগীরা। বেশির ভাগ ওয়ার্ডের আশপাশে নানা ধরনের বর্জ্য  প্রতিনিয়তই ফেলে রাখা হচ্ছে। ক্লিনার-সুইপাররা কাজ না করে আড্ডা আর গল্প করে সময় পার করে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী, নার্স ও ডাক্তারদের বিছানাপত্র এবং অ্যাপ্রোনসহ ব্যবহূত কাপড়চোপড় নোংরা, দূষিত পচা পানিতে ধোয়া হচ্ছে। রোগীর মলমূত্র, পুঁজ আর রক্তমাখা এসব কাপড়চোপড়, চাদর, বালিশের কাভার কোনোমতে ধুয়ে শুকানোও হচ্ছে নোংরা পরিবেশেই। ভালোভাবে পরিষ্কার না করায় জীবাণুসহ নোংরা অবস্থায় চাদর, কম্বল, বালিশের কভার ইত্যাদি রোগীদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতাল আছে, যন্ত্রপাতি ওষুধ-পথ্যের সরবরাহ যাচ্ছে নিয়মিত, আছে চিকিত্সক, নার্স, আয়াসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী; শুধু নেই কাঙ্ক্ষিত চিকিত্সাসেবা। সরকারি হাসপাতালে অনেক দামি ও দরকারি যন্ত্রপাতি পড়ে থাকে, অনেকদিন পর্যন্ত সেগুলো আলোর মুখই দেখতে পায় না। আবার অনেক জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে এমন অত্যাধুনিক মেশিন পাঠানো হয়, যা চালানোর মতো দক্ষ জনবল তাদের নেই। ফলে সরকারি তহবিলের অপচয় ছাড়া আর কিছু হয় না। সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপে এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির গুরুতর তথ্য জানা গেছে।

 কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে ২১ শতাংশ চিকিত্সা যন্ত্রপাতির প্যাকেটই খোলা হয় না। ১১ শতাংশ ব্যবহারের আগেই নষ্ট হয়ে যায়, ১১ শতাংশ যন্ত্রপাতি ঠিক থাকলেও ব্যবহারই করা হয় না, ১০ শতাংশের ব্যবহার হয় আংশিক। বাকি থাকল ৪৭ শতাংশ। জরিপে সে সম্পর্কে তথ্য না থাকলেও সাধারণ রোগীরা যে বঞ্চিতই থেকে যায়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজধানী থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লি পর্যন্ত সর্বত্রই অভিন্ন অবস্থা। চিকিত্সকের বদলে নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়ারা রোগী দেখা, ব্যবস্থাপত্র দেওয়া থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচার পর্যন্ত করছেন অবলীলায়। এতে মাঝেমধ্যেই রোগীর পেটের ভিতর গজ-ব্যান্ডেজ, ছুরি-চাকু রেখে সেলাই করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে থাকে। ওয়ার্ডবয়-আয়ার ‘ডাক্তার সাজা’র মধ্যেই সরকারি হাসপাতালের চিকিত্সাসেবা সীমাবদ্ধ থাকছে না, আছে বহিরাগত দালালদের অন্তহীন উত্পাত। দালালরা নানা কায়দা-কৌশলে অসহায় রোগীদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। এসব দেখভালের যেন কেউ নেই। খোদ রাজধানীতেই সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিত্সাসেবা নাজুক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বড় বড় হাসপাতাল আছে, চিকিত্সা সরঞ্জামেরও অভাব নেই, শুধু সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতায় সেবাবঞ্চিত থাকছেন রোগীরা। ডাক্তারের অবর্তমানে ওয়ার্ডবয় আর নার্সদের গাফিলতিতে আয়ারা হয়ে ওঠেন সর্বেসর্বা। আছে দালালদের সীমাহীন উত্পাত। হাসপাতালে ভর্তি করতে দালাল, ওয়ার্ডে বেড পাওয়া নিশ্চিত করতে দালাল, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেও দালালদের সাহায্য নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। পঙ্গু ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে রোগীর জন্য ট্রলি ব্যবহার করতেও গুনতে হয় টাকা। রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকা ট্রলি নিয়ন্ত্রণে রেখে হাসপাতালে বাড়তি টাকা কামায় বহিরাগতরা। ছুটির দিন আর রাতের বেলায় হাসপাতালগুলোর চেহারা যেন আমূল পাল্টে যায়। বহু খোঁজাখুঁজি করেও কর্মরত ডাক্তারদের সন্ধান মেলে না। দরজা আটকে বিশ্রামে থাকা নার্সদের ডাকলে রীতিমতো রক্তচক্ষু দেখতে হয়।

এইরকম আরো অনেক সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো, যার ফলে সাধারণ রোগীদের পোহাতে হচ্ছে নানারকমের দুর্ভোগ এবং রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে তাদের মৌলিক মানবাধিকার থেকে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু নজরদারিই পারে রোগীদের উন্নতমানের চিকিত্সা সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান করতে। তাই আমরা চাইব যে মন্ত্রণালয়ের সুষ্ঠু নজরদারির মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালের সমস্যাগুলোর সমাধান হবে, রোগীদের উন্নতমানের চিকিত্সা সেবা নিশ্চিত হবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়