দুর্বিষহ জীবনের বর্ণনা শুনলেন বিচারপতিরা

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২১, ২১:১০

আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং এন্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডে অর্থ গচ্ছিত রেখেছিলেন অনেকেই। গচ্ছিত কয়েকশত কোটি টাকার সেই অর্থ ফেরত না পেয়ে এখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক আমানতকারী। নিদারুণ কষ্টে জীবনযাপন করছেন তারা। কেউ চিকিৎসা করাতে পারছেন না, আবার কেউ সন্তানদের ভর্তি করাতে পারছেন না স্কুলে। পরিবার পরিজন নিয়ে তাদের এই দুর্বিষহ জীবনের কাহিনী অশ্রুসিক্ত নয়নে শোনালেন উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের।

তাদের মর্মস্পর্শী ঐ বর্ণনা শুনে হাইকোর্ট বলেছে, এতো হৃদয় ভেঙ্গে দেওয়ার মত ঘটনা। খুবই বেদনাদায়ক। কিভাবে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পেতে পারেন সেটা নিয়ে সকলকে ভাবতে হবে। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ রবিবার (৩ জানুয়ারি) এ মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে চার আমানতকারী বক্তব্য এফিডেভিট আকারে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।  

পিপলস লিজিংসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত প্রশান্ত কুমার হালদার। যিনি পিকে হালদার নামেই পরিচিত। তিনি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। সেখানে খুলেছেন কোম্পানি। এ সংক্রান্ত তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পেয়েছে দুদক। সেই তথ্য গতকাল হাইকোর্টে উপস্থাপন করেছে দুদক কৌসুলি খুরশীদ আলম খান। তিনি জানান, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড অ্যালার্ট শিগগিরই জারি হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের আদালত থেকে তার বিরুদ্ধে জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুলিপিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে ইন্টারপোলে। 

পিপলস লিজিংয়ে অর্থ আমানত রেখে এখন ফেরত পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন আমানতকারীরা। অর্থ ফেরত পেতে তারা দ্বারস্থ হচ্ছেন বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থানে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তাদের কোন আশ্বাসবাণী শোনাতে পারেনি বলে হাইকোর্টকে জানায় আমানতকারীরা। গতকাল পিকে হালদার সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে হাইকোর্টে ভুক্তভোগী হিসেবে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন চার আমানতকারী। তাদেরই একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে নাশিদ কামাল। তিনি আদালতে বলেন, আমিসহ আমাদের পরিবারের ৫ জন পিপলস লিজিংয়ে অর্থ আমানত রাখি। এর মধ্যে আমার চাচা মোস্তফা জামান আব্বাসী রেখেছেন তিন কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছিলো বলেই সেখানে আমরা সরল বিশ্বাসে টাকা রেখেছি। আমরা তো এদেশের নাগরিক। আমরা কার কাছে যাব! কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও উনারা বলছেন কিছু জানে না। 

এক কোটি টাকা রেখেছিলেন সামিয়া বিনতে মাহবুব। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এখন চাকরিহীন। তার মধ্যে সামিয়া ক্যান্সার আক্রান্ত। এমতাবস্থায় নিদারুণ কষ্টে দিনযাপনের বর্ণনা হাইকোর্টে তুলে ধরলেন তিনি। অশ্রুসিক্ত নয়নে সামিয়া বলেন, ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার পর দুই বছর ধরে চাকরিতে নেই। করোনাকালে আমার স্বামীর চাকরিটা চলে গেছে। নেই আয়ের কোন পথ। ফলে দুটি সন্তান নিয়ে আমরা নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করছি। এর মধ্যে অর্থের অভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে চিকিৎসা। স্কুলে ভর্তি করতে পারছি না তাদের। এমনকি এক বছর ধরে সন্তান দুটির মুখে মাছ-মাংস তুলে দিতে পারছি না। একজন মা হয়ে এর চেয়ে বড় কষ্টের আর কি থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিবন্ধিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ রাখার পর যদি আমাদের এই অবস্থা হয় তাহলে আমনতকারীরা কোথায় যাবে? আপনারা আপনাদের সন্তানদের নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছেন আর আমরা টিকে থাকার লড়াই করছি! আমাদের বাঁচান, অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করে দিন। 

অশ্রুসিক্ত নয়নে মুক্তিযোদ্ধা শওকতুর রহমান বলেন, ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্যই এখানে টাকাটা রেখেছিলাম। জীবন বাজি রেখে এই দেশ স্বাধীন করেছিলাম, কিন্তু প্রতারিত হওয়ার জন্য নয়। গচ্ছিত টাকা না পেয়ে এখন দুর্বিষহ জীবন যাপন করছি। 

খালেদ মনসুর ট্রাস্টের হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ২০০৮ সালে এই ট্রাস্ট যাত্রা করে। যমুনা ও ইউসিবিএল ব্যাংকে ট্রাস্টের নামে থাকা দশ কোটি টাকা পিপলস লিজিংয়ে এনে রাখা হয়। বেশি লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় এটা করা হয়। কারণ আমরা সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করি। সেজন্য ঐ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এখন ট্রাস্টের আয়ের পথ বন্ধ। অর্থটা ফেরত পেলে আবার সুষ্ঠুভাবে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। 

আদালতে দুদক কৌসুলি বলেন, আমানতকারীদের বক্তব্যগুলো শুনায় তারা কৃতজ্ঞ কোর্টের প্রতি। আদালত বলেন, কারো বক্তব্য থাকলে আমরা সারাদিন শুনব। আমাদের ধৈর্যের কোন কমতি নাই। দুদক কৌসুলি বলেন, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত শেষ হতে ৩/৪ মাস লাগবে। এটা আমাকে তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিনউদ্দিন মানিক বলেন, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে নথিপত্র পাঠানোর সকল প্রক্রিয়া চলমান। শিগগিরই সেগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে পৌঁছে যাবে। 

প্রসঙ্গত পিকে হালদারকে দেশে ফেরাতে দুদক কি পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা জানতে চেয়েছিলো হাইকোর্ট। সেই মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিলের দিনে দুদকের সহযোগিতা নিয়ে আমানকারীরা হাইকোর্টে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। 


ইত্তেফাক/এমএএম