দীর্ঘ বিরতির পর ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক এসেছেন ‘এমদাদ’ নামে ব্র্যান্ড ডিজিটাল প্লাটফর্মে। ফ্যাশন নিয়ে তার জীবনের গল্প ও বর্তমানের কাজ নিয়ে এবারের আয়োজন। লিখেছেন নওশীন শর্মিলী
জনপ্র্রিয় ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক দেশিয় ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে। তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। ওই বছর বিচিত্রার ফ্যাশনে সংযুক্ত হওয়ার পর আজ অব্দি ফ্যাশন পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্যুত করতে পারেননি। ৮৫ সাল, সবে মাত্র ঢাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। পরবর্তী সময়ে বিচিত্রায় কাজ, ফ্যাশন, বিপণন, অর্থনৈতিক প্রকল্পসহ নিজেকে নানা ধরনের কাজে লিপ্ত রেখেছেন। ফ্যাশনের সঙ্গে মার্কেটিংয়ের সম্পৃক্ততার আলোকে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগে। অনার্স পরবর্তীকালে মাস্টার্স প্রাক্কালীন শেষ সময় যোগদান করেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠান আরডিপিতে। সেখানে দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ করেছেন সিল্ক সেরিকালচার চাষের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ও হ্যান্ডলুমে পরীক্ষিত সিল্ক উত্পাদনে।
এমদাদ বলেন, ‘৯৭ সালে চলে আসি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকল্প গ্রামীণ চেকের প্রজেক্ট গ্রামীণ উদ্যোগে। এখানে যোগদানের পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একদিকে পরীক্ষিত জুট ও সিল্ক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অন্যদিকে বিশ্ব মহলের সঙ্গে যোগ সূত্র তৈরি হয়ে যায়। গ্রামীণের নোরাড অর্থায়নে জুট প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলাম। সেখানে সুযোগ হয় বিশ্বখ্যাত ডাচ ডিজাইনার লুজমেন ভেন্ডসেন একার, উয়িম, র্যামকো, নাথালি ও আনিতার সঙ্গে। প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে পারদর্শী ছিলেন। গ্রামীণ প্রকল্পের গ্রামীণ চেক তাঁতে তৈরি হতে লাগল হোম-ফার্নিসিংয়ের জন্য জুট ইউনিয়ন ফেব্রিক। গ্রামীণ গ্রুপের মাধ্যমে তামিল নারু ঘুরে এলাম ডাইভারসিফাইড জুট উত্পাদনে। যুক্ত হলাম সেই সময়কার আইজেও’র সঙ্গে। জুট নিয়ে বহুবিধ ফ্যাশন শো’র আয়োজন করলাম। ’
তিনি বলেন, পরবর্তী গ্রামীণের আকর্ষণ ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিল্ক দিয়ে নানা রকম প্রকল্প। সেই সিল্ক চলে গেল সুদূর মার্কিন মুলুকে। এইড টু আর্টিসান’র সহায়তায় গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের রুথ হফ ম্যান’র তত্ত্বাবধানে এবার শুরু করলাম সিল্কের ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে, চেক রেশম সিল্ক, জুট এন্ডি। এবার কাজ শুরু হলো সিল্কের ভিন্ন মাধ্যম টেক্সচার রেশম সিল্ক নিয়ে। যা আমাদের বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের গর্ব। সেই সিল্কের পোশাক পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপার মডেল ম্যান্ডেলা, স্পেনের রানী সুফিয়া, বেলজিয়ামের রাজকুমার। তবে দুটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল সেই সিল্ক প্রোডাক্টের। ‘গ্রামীণ এট হোম’ নামে সিল্কের প্রোডাক্ট বিক্রি করা হতো উড়োজাহাজে। স্লোগান ছিল— তোমাদের একটি প্রোডাক্ট ক্রয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মানিকগঞ্জের তাঁতিদের সিল্ক বুনন ও গ্রামীণ চেকের তাঁতিরা অব্যাহত রাখতে পারবে তাদের তাঁতকে। দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল ক্লিনটনের সফরে গ্রামীণ সিল্কের নানারকম উপঢৌকন দেওয়া ও ভিন্ন ভিন্ন গ্রামীণ চেকের সংমিশ্রণে প্যাচওয়াক কুইল্ট উপহার দেওয়া। সেই কুইল্ট ব্যাপক প্রশংসা পায় মার্কিন মুলুকের হোয়াইট হাউস থেকে। ’
১৯৯৭ সালে এমদাদ হক গ্রামীণ উদ্যোগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শুরু করেন বাংলার মেলা, দীর্ঘ ১৩ বছর। কর্মকালীন সময় তিনি করাচি, ইসলামাবাদ, নেপাল, শ্রীলংকা, ভারত ও মাদ্রিদে এককভাবে দেশীয় তাঁত নিয়ে ফ্যাশন শো করেছেন নিজেকে তুলে ধরার প্রয়াসে। পরবর্তী সময়ে শুরু হয় নিজ ব্র্যান্ডের ‘স্টুডিও এমদাদ’। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে কর্মবিরতির কারণে নিজের ব্র্যান্ডকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক বর্তমানে ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও মেধা’র ফাউন্ডার। অসুস্থতা কাটিয়ে নিজেকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন। তবে এবার মাধ্যমটি হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যম—কোনো বুটিক বা শপ নয়। প্রতিনিয়ত ফেসবুক— IamEmdadHoque এই পেজের মাধ্যমে এমদাদ হক তুলে ধরছেন নতুন আঙ্গিকে তার বিশেষত্ব, পোশাক ও অন্যান্য আইটেম। এবার তিনি পরিবেশবান্ধব রিসাইকেল সুতি হাতে বানানো কাঁথাযুক্ত প্যাচওয়াক কুইল্ট আনছেন দেশিয় আমেজে। এছাড়া বর্জ্য সুতি সুতায় হাতে কাটা ও তাঁতে তৈরি খাদি কাপড়ের পঞ্জ, ছেলে-মেয়েদের খাদি ও চেক শাল। আছে বছরজুড়ে নতুন নতুন আকর্ষণ। আরও থাকছে গামছা টাই-ডাই তৈরি ফিউশন পোশাক। এবারের মূল লক্ষ্য জিরো ওয়েস্টেজ পরিবেশবান্ধব পোশাক ও অন্যান্য আইটেম। বিশ্ব ফ্যাশন মহলে যে স্লোগানের ঝড় বইছে। সেইসঙ্গে এমদাদের আয়োজনে রয়েছে বিয়ের পোশাক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশী ডুপিয়ান ছাড়াও থাকছে জামদানী দিয়ে আচকান। চাইলে করে দেওয়া যাবে হাতে বানানো পাগড়ি ও মেচিং হালকা ওজনের শাল বা উত্তরীও । নকশায় থাকবে পছন্দসই জারদোজি, কারচুপি ও এম্ব্রয়ডারি। তবে দাম নির্ভর করবে মেটারিয়াল ও নকশার ওপর।
মডেল সুজন, টুম্পা, বৃষ্টি, মইত্রী
ছবি নীরব আদ্র
