মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা ও বাংলাদেশ

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ২১:২৬

মুক্তিযোদ্ধা এমন একটি নাম, যে নামের সঙ্গে একটি দেশ ও জাতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্ম না হলে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করত কি না, সন্দেহ। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা নামক সূর্যের উদয় হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন। যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি, সুরাজনীতির চর্চা, গণতান্ত্রিক অধিকার, সাম্য ও ন্যায়নীতিতে পরিপূর্ণ থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে; স্বাধীনতার পর প্রায় অর্ধশত বছর পার করতে চলেছি। কিন্তু আমরা কি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?

মহান মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে শোষণমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ তথা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিত্সা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, কর্মসংস্থান প্রভৃতি নিশ্চিত করে সমাজের সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা। মুক্ত চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সব নাগরিকের জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকারসমূহ নিশ্চিত করা। বাঙালির নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা উদ্দেশ্য রক্ষায় আমরা ব্যর্থ হয়েছি। স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি ঠিক, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ গড়তে পারিনি। আজও অনেকে তাদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং সামাজিকভাবে অবহেলিত। সঠিক বাসস্থান, স্বাস্থ্য, খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত। সমাজব্যবস্থায় এখনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিদ্যমান। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কতিপয় বিত্তশালী ও টেন্ডারবাজের হাতে কুক্ষিগত। মুক্তিযোদ্ধারা দিগন্তের ঈষাণকোণে বৈষম্যের যে ঘনঘটা দেখে দেশ স্বাধীনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, সেই বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। এই বৈষম্য তথা অসমতাই মানবসমাজের উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রধান প্রতিবন্ধক। এর ফলে ধনী আরো ধনী,  গরিব আরো নিঃস্ব হচ্ছে। যদিও স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষে মানুষে অসমতাও বেড়ে গেছে। সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাই হচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য আর তার থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকট। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অভিশাপমুক্ত করতে হলে প্রথমেই সম্পদের সুষম বণ্টন-ব্যবস্থার ওপর নজর দিতে হবে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার এই বৈষম্য লাগামহীনভাবে বাড়তে পারে না, যদি নীতি ও আইনের দ্বারা সব ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়।

সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানে ঘুষ-বাণিজ্যের প্রাদুর্ভাব। সর্বত্র অনিয়ম আর দুর্নীতি বিরাজমান। দুর্নীতি আমাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পরও দুর্নীতির কারণে আমরা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হতে পারিনি। এ কারণে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং এর থেকে সৃষ্ট সামাজিক সংকটের সমুদ্রে আমরা ভেসে যাচ্ছি। দুর্নীতি নামক এই ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার প্রসার ঘটানো। দুর্নীতি রোধে আইনের কঠোরতা বাড়াতে হবে এবং সরকারের পাশাপাশি সর্বস্তরের সচেতন নাগরিকদেরও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের বয়কট করতে হবে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

একটি দুর্নীতিমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়াই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও অপসংস্কৃতিমুক্ত নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে দেশ গড়তে এগিয়ে যাই।

n লেখক :শিক্ষার্থী, বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ,

 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়