জর্জিয়ায় জয়ের জন্য পর্যাপ্ত ভোট ‘খুঁজে দিতে’ বললেন ট্রাম্প!

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২৬

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল উলটে দিতে জর্জিয়ার শীর্ষ নির্বাচন কর্মকর্তাকে পর্যাপ্ত ভোট ‘খুঁজে দিতে’ বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত শনিবার জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেট ব্র্যাড রাফেনস্পারগারকে ফোন করে ট্রাম্প এ কথা বলেন। ফাঁস হওয়া ট্রাম্পের ফোনালাপের অডিও রেকর্ডে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রথম প্রকাশিত রেকর্ডিং অনুযায়ী ট্রাম্প রাফেনস্পারগারকে বলেন, ‘আমি কেবল ১১ হাজার ৭৮০টি ভোট পেতে চাই। উত্তরে রাফেনস্পারগার বলেন, জর্জিয়ার ফলাফল সঠিক ছিল। খবর সিএনএন ও বিবিসির।

গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন জর্জিয়াসহ অন্যান্য সুইং অঙ্গরাজ্যে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। কিন্তু ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে করা ৬০টি মামলা আদালত খারিজ করে দিয়েছে। কয়েকটি রাজ্যের ভোট পুনর্গণনা এবং আইনি আপিল শেষে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৫০টি রাজ্য নির্বাচনের ফলাফলের অনুমোদন দিয়েছে। নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে বাইডেন ৩০৬টি এবং ট্রাম্প ২৩২টি ভোট পেয়েছেন। আগামীকাল বুধবার মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে এই নির্বাচনের ফলাফলকে অনুমোদন দেবে। বাইডেন ২০ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরাজয় মেনে নেননি। তিনি নির্বাচনের ফলাফল উলটে দিতে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের চাওয়া অনুযায়ী কাল বুধবার কংগ্রেসে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা বাইডেনের জয়ের ব্যাপারে আপত্তি জানাবেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব প্রচেষ্টা সফল হবে না। বাইডেনই ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন।

এই পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচনের ফল নিজের পক্ষে আনতে জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেটকে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জর্জিয়ার নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন দাবি করে রাফেনস্পারগারকে অতিরিক্ত ১১ হাজার ৭৮০ ভোট খুঁজে দেওয়ার আহ্বান জানান। এটা হলে ঐ রাজ্যে ট্রাম্পের মোট ভোটের সংখ্যা হবে ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩৪, যা বাইডেনের প্রাপ্ত ভোটের চাইতে একটি ভোট বেশি। ট্রাম্প বলেন, ভোট পুনর্গণনা করা হয়েছে আপনার দাবি মিথ্যা নয়। এ সময় রাফেনস্পারগার ট্রাম্পকে বলেন, আপনার কাছে থাকা তথ্যটি ভুল।

এ সময় ট্রাম্প বলেন, এমন গুজব রয়েছে, ফুলটন কাউন্টি থেকে ভোটের সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যালট ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তবে রাফেনস্পারগারের আইনজীবী বলেছেন, এমন কিছুই হয়নি। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভাব্য আইনি পরিণতির জন্য হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনি জানেন যে তারা কী করেছে এবং আপনি বিষয়টি উত্থাপন করছেন না। এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। আপনি এমনটা হতে দিতে পারেন না। এটি আপনার এবং আপনার আইনজীবী রায়ানের জন্য অনেক ঝুঁকির হবে।’

ট্রাম্প রাফেনস্পারগারকে বলেন, আপনার রাজ্যের ফলাফল পুনরায় যাচাই করা উচিত। আপনি এটি পুনরায় যাচাই করতে পারেন, তবে রাজ্যটিতে এই ফল যাচাইয়ের কাজ এমন লোকদের নিয়ে করতে হবে, যারা উত্তর খুঁজে পেতে চান। এমন লোকদের নেওয়া যাবে না, যারা উত্তর খুঁজতে চান না।

জবাবে রাফেনস্পারগার বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট, আপনার কাছে তথ্য জমা দেওয়ার মতো লোক রয়েছে এবং আমাদেরও এমন লোক আছে, যারা তথ্য জমা দেয়। তারপরে এটি আদালতের সামনে আসে এবং আদালত একটি সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদেরকে আমাদের এই সংখ্যার পক্ষে দাঁড়াতে হবে, কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সংখ্যা সঠিক।

রবিবার ট্রাম্প টুইটে অভিযোগ করেন যে, রাফেনস্পারগার ভোট জালিয়াতির বিবরণ দেয়নি। তার কোনো সূত্রই নেই! জবাবে পালটা টুইটে রাফেনস্পারগার বলেন, শ্রদ্ধার সঙ্গে বলছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, আপনি যা বলছেন তা সত্য নয়। সত্য প্রকাশিত হবে। হোয়াইট হাউজ অডিও ফাঁসের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেছেন, ট্রাম্পের এই ফোন ক্ষমতার প্রবল অপব্যবহার। শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা অ্যাডাম শিফ বলেছেন, এই টেপ ফাঁসের মাধ্যমে ট্রাম্পের গণতন্ত্রের প্রতি অবজ্ঞা আরো একবার সামনে এসেছে। মধ্যপন্থি রিপাবলিকান অ্যাডাম কিনজিংগার টুইট করে বলেন, নির্বাচনি ফলের বিরুদ্ধে এমন কথাবার্তা কংগ্রেসের প্রতিটি সদস্যের জন্য অনেক সাংঘাতিক বিষয়। আপনি সেটা করতে পারেন না, যদি করতেই হয় তাহলে পরিষ্কার নীতিবোধ থেকে করতে হবে।

জর্জিয়ায় ভোট জালিয়াতির কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ঐ অঙ্গরাজ্যে পর পর তিনবার ভোট গণনা করেছে। কিন্তু বড় কোনো পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের এই ফোনালাপে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তিনি কেবল প্রেসিডেন্ট-পরবর্তী ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কৌশল চালাচ্ছেন বা চেষ্টা করছেন তার তহবিলের সংগ্রহ বাড়াতে। ট্রাম্পের ফাঁস হওয়া এই ফোনালাপটি আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, আমি চাই আপনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন, যেখানে তিনি রাজনৈতিক সহায়তার জন্য বিদেশি নেতাকে চাপ দিয়েছিলেন। সেই যোগাযোগের কারণে ট্রাম্প অভিশংসনের মুখে পড়েন। এই ফোনালাপ ফাঁসের কারণে তার পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন আদায় আরো কঠিন হবে।

মার্কিন নির্বাচন শেষ :সাবেক ১০ প্রতিরক্ষামন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ১০ জন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন নির্বাচন শেষ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উচিত এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন না তোলা। ওয়াশিংটন পোস্টে তাদের প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এ কথা বলেছেন। তারা বলেছেন, নির্বাচনের ভোট পুনর্গণনা ও অডিট হয়েছে। আদালতে চ্যালেঞ্জও জানানো হয়েছে। গভর্নররা ফলাফল প্রত্যায়ন করেছেন। ইলেকটোরাল কলেজ ভোট দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময়ও শেষ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনার সময় এসে গেছে। চিঠিতে সই করা ১০ সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী হলেন, ডিক চেনি, জেমস ম্যাতিস, মার্ক এসপার, লিওন পনেত্তা, ডোনাল্ড রামসফেল্ড, উইলিয়াম কোহেন, চাক হাগেল, রবার্ট গেটস, উইলিয়াম পেরি ও অ্যাশতোন কার্টার। তারা বলেছেন, ভোটের বিরোধে সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করা উচিত হবে না। সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের এই বক্তব্য বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে বেশ চাপে ফেলেছে। চিঠিটি প্রকাশের পর সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী কোহেন সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেন, ট্রাম্প দেশকে যে ‘অসাংবিধানিক পথে’ নিয়ে যাচ্ছিলেন, তার বিরুদ্ধে সতর্কতার পূর্বাভাস হিসেবেই আমাদের এই উদ্যোগ। এটি ছিল আমেরিকার জনগণের কাছে আমাদের আহ্বান।

সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে জর্জিয়ায় ভোট আজ

সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্ধারণে আজ মঙ্গলবার জর্জিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের আগের দিন সোমবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজ নিজ দলের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় যোগ দেন। যদি দুই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বিজয়ী হন, তবে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটরের সংখ্যা সমান সমান হবে। এমন অবস্থায় নির্বাচিত নতুন ভাইস-প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ভোট দেওয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত জানাবেন। আর ইতিমধ্যে নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ আছে ডেমোক্র্যাটদের।