‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমাদের এমপিরা দরজা টোয়াই পাইত নো’

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ২২:২৭

নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা বলেছেন, ‘শোনেন দুঃখের সহিত বলছি, আমাদের বৃহত্তর নোয়াখালীর আওয়ামী লীগের কিছু চামচায় কয় অমুক তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছি। বিএনপির দুর্গ ভাঙছে? তিন-চারটি আসন ছাড়া বৃহত্তর নোয়াখালীতে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমাদের এমপিরা দরজা টোয়াই পাইতো নো (পালাবার জন্য দরজা খুঁজে পাবে না)। এটাই হলো সত্য কথা। সত্য কথা বলতে হবে। আমি সবসময় সত্য কথা বলি। সাহস করে সত্য কথা বলছি।’

বসুরহাট পৌরভবন চত্বরে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা ও সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। আবদুল কাদের মির্জা নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহসভাপতি। এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন। গত বৃহস্পতিবার দেওয়া তার এই বক্তব্যের ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় দলীয় কিছু স্থানীয় নেতা ও এমপিকে ইঙ্গিত করে আবদুল কাদের মির্জা বলেন, ‘নোয়াখালীর মানুষজন বলে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু আপনাদের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। সন্ত্রাসী পালেন। গুন্ডা পালেন, নোংরা ছেলেদের পালেন। এদেরকে নিয়ে বড় বড় মিছিল করেন। আমারে দায়িত্ব দেন, টাকা দেন,গাড়ি দেন। আমি যদি লোক আনতে না পারি আমাকে রাজনীতি থেকে বিদায় করে দিয়েন। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা সত্য কথা লেখেন না।

তিনি বলেন, এই বৃহত্তর নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদের সাহেব, ব্যারিস্টার মওদুদ সাহেব, জামায়াতের আবু নাসের সাহেব—এই তিন জন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কোনো নেতা নেই। উনাদের সমমর্যাদার কোনো নেতা নেই। কোনো নেতা সৃষ্টি হয়নি। আমরা কার নাম বেচুম। এখন তো ওবায়দুল কাদের, মওদুদ আহমদের নাম বিক্রি করি। তারা তিন জন তো অসুস্থ, তারা মারা গেলে কার নাম বিক্রি করবে, কেউ নাই।

আবদুল কাদের মির্জা বলেন, ‘প্রকাশ্যে দিবালোকে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে, তারা হচ্ছে নেতা। টেন্ডারবাজি করে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা লুটপাট যারা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। পুলিশের, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি দিয়ে যারা ৫ লাখ টাকা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। গরিব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিয়নের চাকরি দিয়ে ৩ লাখ টাকা যারা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। তারা গুন্ডা পালে, সন্ত্রাসী পালে। ওবায়দুল কাদেরের মতো নেতার গালে জুতা মারো তালে তালে স্লোগান যারা দেওয়ায় তারা হচ্ছে নেতা। ভয় পাই না।

জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সমালোচনা করে আবদুল কাদের বলেন, নোয়াখালী কমিটি করেছে। জাবেদ সাহেব কে? ওয়ান ইলেভেনের পরে আমাদের নোয়াখালীর এক নেতা নিজের চামড়া বাঁচানোর জন্য মঈন ইউ আহমেদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য, মঈন ইউ আহমদের ছোট ভাই জাবেদকে (মিনহাজ আহমেদ জাবেদ) ধরে । তার সঙ্গে লেনদেন করে যোগাযোগ করে নিজের চামড়া বাঁচিয়েছেন। এখন সে নোয়াখালীর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট । থাকে আমেরিকায়। এখন সেই জাবেদ এবং হাওয়া ভবনের মানিক (আতাউর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মানিক) জেলা আওয়ামী লীগের নেতা। অথচ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিনের মতো ত্যাগী ও নির্যাতিত ব্যক্তিকে করা হয়েছে উপদেষ্টা। এটা হলো আমাদের কমিটি। আবদুল কাদের মির্জা বলেন, দলের প্রয়াত সাবেক তিন নেতা আবদুল মালেক উকিল, শহীদ উদ্দিন এস্কেন্দার ও নুরুল হক সাহেবের নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগে অপরাজনীতি চলছে। আওয়ামী লীগের এক নেতা টাকা খায় নিজাম হাজারী ও একরাম চৌধুরী থেকে। একরাম ভাই ফুলগাজীর চেয়ারম্যান ছিল। কি অপরাধ ছিল তার। তার গাড়ি সুদ্ধ জ্বালিয়ে দিয়েছে, এটা কোন রাজনীতি।

আবদুল কাদের মির্জা বলেন, আমি আজ বলব আমাকে বহিষ্কার করুন। তবু আমি মাইক লাগিয়ে বঙ্গবন্ধুর কথা বলব। শেখ হাসিনার উন্নয়নের কথা বলব। ওবায়দুল কাদেরের উন্নয়নের কথা বলব। জেলে দেবেন। ৮২ সালে জেল খেটেছি। তখন এরা ছিল মায়ের পেটে। আমাকে জেলের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। মেরে ফেলবেন? আমার সঙ্গে যে ছেলেটা থাকে তাকে কবরের জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছি। আমরা ভয় করি না। এক ঘণ্টার বেশি বক্তব্যে আবদুল কাদের মির্জা তার আপন বড় ভাই মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সহধর্মিণী (ইশরাতুন্নেসা কাদের) তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন বলে উল্লেখ করেন। এদিকে বৃহস্পতিবারের ঐ বক্তব্যের পর রবিবার সকালে উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন বিষয়ে মতবিনিময় সভায় আবদুল কাদের যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। রবিবার তিনি বলেন, কয়েক জন নেতা ষড়যন্ত্র করে আমার এখানে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য অস্ত্র পাঠিয়েছেন। বক্তব্যের এই পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ‘আর কিছু বলবেন কি না’ জানতে চাইতেই আবদুল কাদের ডিসির বিরুদ্ধে বক্তব্যে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে বেলা ১১টার দিকে তিনি শহরের জিরো পয়েন্টে বঙ্গবন্ধু চত্বরে অবস্থান নেন। ততক্ষণে সেখানে হাজির হন কয়েক হাজার দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থক। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে টায়ার জ্বালিয়ে হাতে ঝাড়ু নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন সমর্থকেরা। বিক্ষোভকারীরা ডিসি, এসপির অপসারণ দাবি করে তাদের বিরুদ্ধে নানা স্ল্লোগান দেন।