কথায় আছে—‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা?’ ঢাকার অবস্থা বহুলাংশে এই প্রবাদের মতো। চার শতাধিক বত্সরের পুরাতন এই মহানগরের বিভিন্ন অংশে রহিয়াছে বিচিত্র সকল সমস্যা। এই সমস্যার পাহাড় রাতারাতি জমে নাই। এই জন্য ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ অংশের দুই নগরপিতার জন্য ঢাকার গভীরতর জঞ্জাল অপসারণ করিবার ঘটনাটিকে গ্রিক হারকিউলিসের মতোই সুকঠিন কাজ বলা যায়। এই মহানগরে সমস্যার জঞ্জাল এত গভীরে প্রোথিত যে, তাহা অপসারণ করিয়া ইহাকে যথার্থই নান্দনিক করিয়া তোলা যেন ইউটোপীয় স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন আমাদের দুই নগরপিতা কেবল দেখাইতেছেন না, তাহা বাস্তবায়নে আদা-জল খাইয়া নামিয়াছেন। পরিচ্ছন্ন ঢাকা উপহার দেওয়া; জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ, বিভিন্ন খাল ও বুড়িগঙ্গা নদী দখলমুক্ত করা, মশাবাহিত রোগ হইতে নগরবাসীকে রক্ষা করা, ফুটপাত পথচারীদের ব্যবহার উপযোগী রাখা; তারের জঞ্জাল, অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ করা—ইহার জন্য যেই ধরনের কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে, আমরা তাহারই দ্ব্যর্থহীন শপথ দেখিতে পাইতেছি দুই নগরপিতার শরীরী ভাষায়।
আমরা তো শুরুতেই বলিয়াছি, ইহা হারকিউলিস কাজ। অসম্ভব বলিলেও কম বলা হয়। কিন্তু তাহা অপসারণের জন্য যেই সদিচ্ছা ও সহযোগিতাপূর্ণ ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা দরকার, তাহা বিগত কয়েক মাসে আমরা উভয় নগরপিতার মধ্যে দেখিয়াছি বটে। ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের কথা ধরা যাউক। তাহার সার্বিক পারিবারিক ইতিহাস-ঐতিহ্য শিক্ষা-চেতনা বলিয়া দেয়—তিনি শূন্যে ফাঁকা বুলি ছুড়িবার মানুষ নহেন। এই তো বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে তিন সপ্তাহ পূর্বে তিনি বলিয়াছেন—‘চুপ কইরা সহ্য করি বইলা দুর্বল ভাইবো না।’ তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়া বলিয়াছেন—উত্তরাধিকারসূত্রে অনেক জঞ্জাল জমিয়াছে। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পর্যায়ক্রমে সকল সমস্যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লওয়া হইতেছে। কোনো কিছুতেই ছাড় দেওয়া হইবে না। তিনি দেখিয়াছেন, আদি বুড়িগঙ্গা ও তাহার আশপাশে সিটি করপোরেশন বর্জ্য ফেলিয়া সকল নদী ভরাট করিয়া ফেলা হইতেছে। তিনি প্রশ্ন তুলিয়াছেন—তাহা হইলে নদীগুলি ব্যবস্থাপনায় এতদিন কী কার্যক্রম পরিচালনা করা হইয়াছে? আমরা দেখিয়াছি, ইতিমধ্যে বুড়িগঙ্গা চ্যানেল পুনরুদ্ধার করিতে এমআইএসটিকে (মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে। তাপস চাহিতেছেন—আদি বুড়িগঙ্গাকে সম্পূর্ণরূপে পুনরুদ্ধার করিয়া সেইখানে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করিয়াছেন—যত প্রতিকূলতাই আসুক, সমস্যা আসুক না কেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হইতে কেহ তাহাকে বিচ্যুত করিতে পারিবে না। তাহার এই শক্তির উত্স স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং নিশ্চয়ই তিনি তাহার স্বীয় লক্ষ্য পূরণ করিতে পারিবেন। এই জন্য তিনি বারংবার বলিতে পারেন—‘যত সমস্যা আসুক, ইনশাল্লাহ আমরা ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রতিহত করব এবং উন্নত বাংলাদেশের উন্নত রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে আমরা গড়ে তুলব।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের ক্ষেত্রেও আমরা অভূতপূর্ব উদ্যম, শক্তি, সাহস ও দৃঢ়চেতা মনোভাব দেখিতে পাইয়াছি। কিছুদিন পূর্বে ঢাকা ওয়াসার নিকট হইতে জলাবদ্ধতা নিরসনের গুরুদায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নিকট হস্তান্তর করা হয় নগরপিতাদ্বয়ের উদ্যোগে। সেইখানে আতিক বলিয়াছেন—ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়। ইচ্ছা ও উপায়ের সেতুবন্ধ হইল রাজনৈতিক নেতৃত্ব। খালগুলি দখলমুক্ত করিবার প্রশ্নে মেয়র বলিয়াছেন—পাঁচজনের হীনস্বার্থের কারণে ৫০০ জন কষ্ট পাইতে পারে না। আতিকের পশুপ্রেমী দিকটিও তাত্পর্যপূর্ণ। সড়কে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন লইয়া প্রাণিপ্রেমীদের উদ্বেগের বিষয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করিয়াছেন তিনি। এই বেওয়ারিশ কুকুরগুলিকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা ভাবিয়াছেন। হত্যা নহে, কুকুরগুলিকে ভ্যাকসিনেশনের মাধ্যমে বন্ধ্যাকরণের পরিকল্পনা করিয়াছেন।
সুতরাং আমরা আশা করিতেই পারি, একটি আধুনিক ও নান্দনিক ঢাকা পাইতে আমাদের অপার সম্ভাবনা রহিয়াছে। ইহার জন্য এই ‘কাজের মানুষ’ দুই নগরপিতাকে সকল দিক হইতে সকলকে সহযোগিতাও করিতে হইবে। সকলের সহযোগিতা ভিন্ন কোনো ভালো কাজ সম্ভব নহে।
