ক্ষমতায় থাকতে ট্রাম্পের এখনো তিন পথ খোলা!

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৮

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের চাপের পরীক্ষা বা ‘স্ট্রেস টেস্ট’। যিনি গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। প্রকাশ্যে বলেছিলেন কেবল জালিয়াতির মাধ্যমেই তাকে            হারানো সম্ভব। এরপর তিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন, অতএব এই নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে। এজন্য তার কোনো প্রমাণের প্রয়োজন নেই। ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা এই জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফল উলটে দিতে সব ধরনের চেষ্টা করেছেন। আইনের মধ্যে থেকে সব কিছুর চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এসব চেষ্টা চালাতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন গণতন্ত্রকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছেন। এখন পর্যন্ত সেসব পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার তিনটি পথ খোলা রয়েছে।

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সময় বুধবার (বাংলাদেশ সময় আজ বৃহস্পতিবার) মার্কিন কংগ্রেসের দুই কক্ষের যৌথ অধিবেশনে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা এবং ফলাফলের বৈধতা দেওয়ার কথা। সেখানে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানোর প্রস্তুতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত ১২ জন রিপাবলিকান সিনেটর ও ১৪০ জন প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আপত্তি জানাবেন বলে জানানো হয়েছে। ভোট গণনা নিয়ে আপত্তি বিবেচনা করবে কংগ্রেস। সেক্ষেত্রে দুই ঘণ্টার বিতর্ক/আলোচনা হবে। নিয়ম অনুযায়ী ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা হবে কি না, তা নিয়ে দুই কক্ষে ভোটাভুটি হবে। কিন্তু রিপাবলিকানরা সব আপত্তি, অভিযোগ উত্থাপনের পাশাপাশি কংগ্রেসে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা নিয়ে ভোট বানচালের চেষ্টা চলবে।

আর যদি ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কংগ্রেসে এ ধরনের ভোট অনুষ্ঠিত না হয় সেক্ষত্রে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের ভিত্তিতে হবে না। তাদের নির্বাচনের ভার কংগ্রেসের ওপর বর্তাবে। প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্ট এবং সিনেট ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে। প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সেখানে জো বাইডেনের জয়ী হওয়ার কথা। এক্ষেত্রে মার্কিন সংবিধানের আলোকে প্রতিনিধি পরিষদের আইনপ্রণেতাদের পরিবর্তে রাজ্য প্রতিনিধিদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা সম্ভব। এক রাজ্য থেকে একজন প্রতিনিধি ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবেন। বেশির ভাগ রাজ্যের প্রতিনিধিদের ওপর রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। পরিস্থিতি সেদিকে গড়ালে প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হবেন। আর সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মাইক পেন্স ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন সেটা ধরে নেওয়া যায়। এই প্রক্রিয়ায় ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকানদের আপত্তি ও প্রচেষ্টার পর কংগ্রেসে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা বন্ধ না হলেও পথ খোলা থাকবে ট্রাম্পের জন্য। যৌথ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। কংগ্রেসে ইলেকটোরাল কলেজ ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করার দায়িত্ব তার। সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি করে এই আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারেন পেন্স। তিনি ১৮ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত বিজয়ীর নাম ঘোষণা করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। যাতে করে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে না থেকে সরাসরি কংগ্রেসের ওপর বর্তায়। সেক্ষেত্রে আগের প্রক্রিয়ায় ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। 

তৃতীয়ত, কিন্তু ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স যদি এই দাসসুলভ বিশ্বস্ততা না দেখান এবং তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে জো বাইডেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জয়ী ঘোষণা করেন, তখনো ট্রাম্পের জন্য দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার আরেকটি পথ খোলা থাকবে। এক্ষেত্রে তিনি উনিশ শতকের ‘সেডিশন অ্যাক্ট’ এর সাহায্য নিতে পারেন। এই আইন অনুযায়ী রাজ্য সরকার কোনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট সেসব রাজ্যের রাজধানীতে ফেডারেল ফোর্স পাঠাতে পারেন। ট্রাম্প সেক্ষেত্রে তার চাওয়া অনুযায়ী রাজ্যগুলোতে আবারও ভোট অনুষ্ঠানের জন্য বা ভোট গণনার জন্য মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য পাঠাতে পারেন। যাতে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় এবং ইলেকটোরাল কলেজ ভোটারদের বদল করা হয়। এরপর নতুন ইলেকটোরাল কলেজ ভোটারদের মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন। যদিও ডেমোক্র্যাটরা এর তীব্র বিরোধিতা করবে।

এই তিনটি পথই সংবিধানের অভিপ্রায়ের সঙ্গে খুবই সংঘাতমূলক। একই সঙ্গে ভোটারদের ইচ্ছা, যুক্তি এবং শিষ্টাচারবিরোধী। যদিও এসব বিষয় ট্রাম্পের কাছে বিবেচ্য নয়, কারণ তিনি শুধু জিততে চান। সেটা যে কোনো মূল্যে। তিনি এসব চেষ্টা করবেন না এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তিনি দেখানোর চেষ্টা করবেন যুক্তরাষ্ট্র এসব চাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে প্রস্তুত নয়।

লেখক :লেবানিজ বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক।