পিলখানা হত্যা মামলায় হাইকোর্টের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামি। গত মঙ্গলবার আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ আপিল দাখিল করা হয়েছে। আপিলে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে এই আসামিদের খালাস দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
উচ্চ ও নিম্ন আদালতের রায় সংযুক্ত করে পূর্ণাঙ্গ এই আপিলে মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৬২৩টি। বহন ও পড়ার সুবিধার্থে এগুলোকে ১৪০টি ভলিউমে ভাগ করা হয়েছে। একইসঙ্গে ৫৫ হাজার ৬২৩ পৃষ্ঠার এক আপিলের মোট ১৪টি কপি দাখিল করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট শাখায়। এ নিয়ে আপিলের ১৪টি কপিতে মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৭২২ পৃষ্ঠা। আর মোট ভলিউমের সংখ্যা গিয়ে পৌঁছেছে ১ হাজার ৯৬০টিতে। ব্যয় হয়েছে ১০ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা। মঙ্গলবার ৯ আসামির প্রধান আইনজীবী এম আমিনুল ইসলামের এলিফ্যান্ট রোডের চেম্বার থেকে ১৫টি ভ্যানে করে কয়েক দফায় এই আপিলের ভলিউমগুলো সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আনা হয়। এরপর আপিল শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা বুঝে নেন।
এর আগে এই মামলায় গত ডিসেম্বরে খালাস পাওয়া ও সাজা হ্রাস হওয়া বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) জওয়ানদের সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে লিভ টু আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিলের ওপর শুনানির জন্য চলতি মাসে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করা হবে বলে ইত্তেফাককে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, শিগিগরই শুনানির আবেদন করব। এরপর আদালতের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে আপিলের শুনানি হবে।
এদিকে দণ্ডিত অন্যান্য আসামির আপিল দায়েরের ক্ষেত্রে যাতে হাজার হাজার পৃষ্ঠা সংবলিত পেপারবুক দাখিল করতে না হয় সেজন্য প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বরাবর আবেদন করেছেন আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী এম আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ কিছু আসামির সাজা বৃদ্ধি চেয়ে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেছেন। পেপারবুক দিয়ে একটি আপিল করার পর অন্যান্য আপিলে পেপারবুক দাখিল থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সেজন্য আমরা আসামি পক্ষ অন্যান্য দণ্ডিত আসামির আপিল পেপারবুক ছাড়াই দায়েরের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সিদ্ধান্ত পেলে পেপারবুক ছাড়াই আপিল দাখিল করা সম্ভব হবে। তখন আপিলের ব্যয় কমে আসবে।
যারা আপিল করেছেন:আপিল করা আসামিরা হলেন মো. কামাল মোল্লা, মনিরুজ্জামান, ইউসুফ আলী, আবু সাঈদ আলম, সাঈদুর রহমান, আনিসুজ্জামান, ফজলুল করিম, বজলুর রশিদ ও সহিদুর রহমান। এই ৯ আসামি উচ্চ ও নিম্ন আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন বলে জানান তাদের আরেক আইনজীবী মো. শাহীন ফারাজী।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহের নামে তত্কালীন বিডিআরের সদর দপ্তর পিলখানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় ২০১৩ সালে ঢাকার আদালত ১৫২ বিডিআর জওয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ১৬১ জনকে। সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা পান আরো ২৫৬ জন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস পান ২৭৮ জন। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। ২০১৭ সালে বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জওয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যাবজ্জীবন দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয় আরো ২০০ জনকে। খালাস পান ৪৫ জন।
গত বছরের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত রায়টি প্রায় ৩০ হাজার পৃষ্ঠার। এ রায়ের অনুলিপি তুলতে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আসামির আইনজীবীকে জমা দিতে হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। গত ১৫ ডিসেম্বর রায়ের অনুলিপি পায় আসামি পক্ষ। ঐ রায় পর্যালোচনা করে আনুষাঙ্গিক নথিপত্র দিয়ে আসামিদের মধ্য থেকে ৯ জন প্রথম আপিল দাখিল করলেন।
