প্রতিদিন ভোর হয়। প্রতিদিন অস্তরাগে সন্ধ্যা নামে। রাত হয়। রাতের আঁধার ছিন্ন করে আবার আসে অবাক সূর্যোদয়। এভাবে দিনের পর রাত; রাতের পর দিন ঘুরতে ঘুরতে সময় এগিয়ে যায়। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরে মিনিট। মিনিটে মিনিটে ঘণ্টা। ঘণ্টায়-ঘণ্টায় দিন। এই দিনের আরেক নাম হচ্ছে ‘অহ’। সপ্ত অহ মিলে সপ্তাহ। তিরিশ দিনে মাস। বারো মাসে বছর। ৩৬৫ দিন। এভাবে বর্ষপরিক্রমা। ছড়ায় বলা হয়েছে
‘বারোমাস, সাতবার
আসে যায় বার বার।’
এমন আসা-যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা জানতে পারি পৃথিবী কত প্রবীণ। আর সে তুলনায় তোমরা কত নবীন। তোমরাও এখন জেনে গেছ পৃথিবী লাট্টুর মতো ঘুরছে। ঘুরছে সূর্যকে মধ্যমণি করে। এমনি করে শতকোটি বছর ধরে পৃথিবী এক-একটি নতুন বছর উপহার দিয়ে চলেছে?
ইংরেজি বছরটির নতুনত্ব আসে জানুয়ারিতে। প্রতিবছর জানুয়ারির প্রথম দিন হয় বছরের নতুন দিন। বছরকে হিসাব করা হয় অব্দ দিয়ে। ইংরেজি বছরটির পরিচয় খ্রিস্টাব্দে। সে হিসাবে একটি অব্দ পেছনে ফেলে এগুচ্ছি আমরা। পেছন ফেলতে ফেলতে ২০২০ সাল মানে বছরের ২০২০ বার বিদায়। এবার ২০২১-এর অভ্যুদয়।
এই অভ্যুদয়ের আমরা হিসাব রাখি যা দিয়ে; তাকে বলা হয় দিনপঞ্জিকা। ইংরেজিতে ক্যালেন্ডার। এটি একটি ল্যাটিন শব্দ। ল্যাটিন শব্দ ‘ক্যালেন্ডি’ থেকে এসেছে ক্যালেন্ডার। যার অর্থ ছিল মাসের প্রথম দিন। এখন এর অর্থের বিস্তৃতি ঘটেছে। ক্যালেন্ডার মানে এখন দিন, সপ্তাহ, মাস এবং বছরের হিসাব। এ হিসাবে পৃথিবী যে ঘুরছে তার গতি, চন্দ্রের গতি; সূর্যের স্থিতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
দিন নিয়ে কত কত মজার মজার কথা আছে। যেমন : ইসলামি মতে শুক্রবার মানে জুম্মার বার। খ্রিস্টান ধর্মমতে রবিবার মানে সানডে (Sunday)। সোমবার মানে মানডে (Moonday)। অর্থাত্ সূর্য-চন্দ্রের নামে নামাঙ্কিত। শুক্রবারের নামে শুকতারা মানে ধ্রুবতারা। ধ্রুবতারা মানে যে পথ দেখায়। রবিবারকে ইংরেজি সানডের পাশাপাশি সাবাথ ডে-ও বলা হয়। এই দিন খ্রিস্টানদের পবিত্র হবার মূলে রয়েছে একটি গল্প। গল্পে আছে, এই রবিবারেই যিশু সমাধি থেকে পুনরায় উঠে এসেছিলেন। তাই এই দিনে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা ধর্মাচার পালন করতে যান। তাদের ই-স্টার সানডে বলেও পবিত্র দিন রয়েছে।
যিশু খ্রিস্টের জন্মতারিখের প্রথম দিনটি থেকে বর্ষ গণনা করা হয়। তাই তো ওদের সনের নাম খ্রিস্টাব্দ। ৫৩২ সালে এক সন্ন্যাসীর কথায় রোম শহর থেকে বছর গণনা শুরু হয়। ২৫ ডিসেম্বর ছিল যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন। এজন্যেই তাঁর অনুসারীগণ এই দিনকে বড়দিন বলে।
প্রতি চতুর্থ বছরেই ইংরেজি ক্যালেন্ডারে একদিন বেশি থাকে। একে বলে লিপ-ইয়ার। বাংলায় অধিবর্ষ। অধিবর্ষে ফেব্রুয়ারি মাস হয় ২৯ দিনে।
ইংরেজি মাসগুলো ২৮, ২৯, ৩০, ৩১ দিনে হয়ে থাকে। এ নিয়ে ছোটবেলায় আমার মা (সদ্যপ্রয়াত শহিদ জায়া বাণীপ্রভা ধর) পয়ারের সুরে বলতেন, ‘তিরিশ দিনেতে হয় মাস সেপ্টেম্বর
এইরূপ এপ্রিল-জুন আর নভেম্বর
২৮ দিনেতে সবে ফেব্রুয়ারি ধরে
একদিন বাড়ে তার চতুর্থ বত্সরে
বাকি সব মাস হয় একত্রিশ দিনে
জানিবে ইংরেজি মাস এইভাবে গণে।’
চলো, এভাবে গুণতে গুণতে একটু শুনি ‘সানডে মানডে’ ছাড়া অন্য বারগুলোর পরিচয়। সে পরিচয়ে জানা যায়, টুয়েসডে এসেছে ‘টিউ’ নামের যুদ্ধের এক দেবতার নাম থেকে।
‘ওয়েডনেসডে’ এসেছে দেবতা ‘ওডেন’-এর নাম থেকে।
থার্সডে হলো ঝড়ের দেবতা। তাঁর মূল পরিচয় ‘থর’ দেবতা নামে। ফ্রাইডে এসেছে দেবতা ওডেনের স্ত্রী দেবী ‘ফ্রিগ’-এর নাম থেকে। আর সেটারডে নামটা এসেছে রোমান দেবতা ‘স্যাটার্ন’-এর নাম থেকে।
চমত্কার এসব দেব-দেবীর নাম বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে আসছে। অথচ, আমাদের প্রতিদিনের স্মৃতি থেকে কতকিছু মুছে যায়। তবে এসব নাম অক্ষয় হয়ে আছে বারের নামের সাথে। এমনকি বার রবি ও সোম ওদের সানডে, মানডের সাথে মিশে আছে। ওদের ‘সান’ সূর্য আমাদের ‘রবি’ও সূর্য; ওদের ‘মানডে’ এসেছে ‘মুন’ থেকে আর মুন মানে চাঁদ; আমাদের সোম মানে চাঁদ। অর্থাত্ ‘সূর্য বার’ এবং ‘চাঁদ বার’। এমনি করে বছরের পর বছর ধরে সূর্য ও চাঁদ বারের মতো অন্যান্য বারও মিশে যাচ্ছে মাসে, বছরের কোলে, মহাকালের গর্ভে। কিন্তু থামছে না, থামবেও না নতুন সূর্য ওঠা রক্তিম প্রভাতের বেলা।
