করোনাকালে হারানো সাহিত্য-স্বজন

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৪৫

জীবন থাকলে মৃত্যু থাকবেই। মুত্যু অবধারিত। তবু সময়ের আগে কারো প্রস্থান হলে স্বাভাবিক মন তা গ্রহণ করতে পারে না। এই করোনাকাল অনেকের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে, তা অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অবাঞ্ছিত। কিছু ক্ষতি তো আর পূরণ হওয়ার নয়। বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমরা হারিয়েছি বেশ কজন সৃজনশীল ও মননশীল সাহিত্যিককে। সাহিত্যের এইসকল স্বজনকে আমরা হারালেও তাঁদের অমর সৃষ্টিকে আমরা পাব আমাদের পাঠের আঙিনায়, সান্ত্বনা সেখানেই।

আমাদের জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে হারানো কেবল বাংলাদেশেরই নয়, বাঙালি মেধা ও মননের ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যে তাঁর অবদান তুলনারহিত। বাঙালির মুসলিম মানস আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকাই অগ্রণী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই কেবল নয়, জাতীয় সকল আন্দোলনেও তিনি সাহসের সঙ্গে অংশ নিয়েছেন। ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় ছিলেন। এমনকি আমাদের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল। বাংলা একাডেমির সভাপতি ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুকে আমি অকালমৃত্যুই মনে করি।

রাহাত খান ছিলেন বাংলাদেশের একজন কথাশিল্পী ও সাংবাদিক। ছোটগল্প ও উপন্যাস এই উভয় শাখাতেই তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় তিনি ষাটের দশক থেকে কর্মরত ছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁকেও হারিয়েছি এই সময়ে। ‘অমল ধবল চাকরি’ কিংবা ‘দিলুর গল্প’ বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ রচনা।

আমরা একই সময়ে হারিয়েছি সংস্কৃতিজন কামাল লোহানীকে। ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ তো বটেই দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সামনের কাতারে ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে তিনি বার্তা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। সংস্কৃতি নিয়ে তিনি অজস্র প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাঁর মতো একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিককেও হারাতে হয়েছে এই মহামারির কালে।

বাংলা একাডেমির প্রাক্তন দুজন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী ও মনজুরে মওলার মৃত্যুকেও স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারি না। সেই ‘তালেব মাস্টার’ কিংবা ‘গলির ধারের ছেলেটি’র স্রষ্টা আশরাফ সিদ্দিকী বাংলাদেশের ফোকলোর-চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। মনজুরে মওলা কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক হিসেবে খ্যাতিমান।

আমরা হারিয়েছি বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, প্রাবন্ধিক ও শিল্পসমালোচক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে। চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীরও প্রাবন্ধিক এবং কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক মকবুলা মনজুর ও  রশীদ হায়দার প্রয়াত হয়েছেন এই সময়ে। কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার ‘স্মৃতি একাত্তর’ নামের যে গ্রন্থমালা সম্পাদনা করেছেন, তা আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অন্তরালে থাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারকে খুঁজে বের করে তাদের পরিবারের সদস্য কিংবা নিকটাত্মীয়দের দিয়ে স্মৃতিকথা লিখিয়ে ইতিহাসের উপকরণ প্রস্তুত করেছেন। ইসমত চুগতাই, কৃষণ চন্দর, সাদত হাসান মান্টো প্রমুখের সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে বাঙালির কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন জাফর আলম। অনুবাদের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছেন। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার মান্নান হীরাকে আমরা হারিয়েছি। ‘লাল জমিন’, ‘ভাগের মানুষ’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘সাদা-কালো’ তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটক। নাটক অনুবাদ ও নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধ রচনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন আলী যাকের। অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক হিসেবে খ্যাতিমান হলেও তাঁর লেখকসত্তাকে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করি। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত শিশুসাহিত্যিক ও কবি মুশাররফ করিমের অকালপ্রয়াণও ঘটেছে এই সময়ে।

ইতিহাসবিদ ও প্রাবন্ধিক সুফিয়া আহমেদ, রতনলাল চক্রবর্তীর মুত্যুও ইতিহাস গবেষণার ক্ষেত্রে ক্ষত সৃষ্টি করবে। রতন চক্রবর্তীর অবদানের সাহিত্যমূল্যও স্বীকার করার মতো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দিন আহমদ প্রাবন্ধিক বিশেষত রাজনৈতিক সাহিত্য রচনায় দক্ষ ছিলেন। তাঁকেও হারাতে হয়েছে এই সময়ে। বাংলাদেশে সংগীত নিয়ে যাঁরা প্রবন্ধ রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য নাম আজাদ রহমান। তাঁকেও হারিয়েছি আমরা।

আমাদের বন্ধুকবি হিমেল বরকতের মৃত্যু মেনে নেওয়া খুব কঠিন। মাত্র ৪২ বছর বয়স। অকালপ্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর অনুজ তিনি। আমারও ভ্রাতৃপ্রতিম এই কবি ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ রচনায় তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

বাংলা ভাষার খ্যাতিমান কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কবি-অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায়, ঔপন্যাসিক নিমাই ভট্টাচার্য, প্রাবন্ধিক সুধীর চক্রবর্তীর মতো গুণীজনকে হারিয়েছি।

করোনাকালের এই নির্মম আঘাতের পরেও হয়তো সাহিত্য সৃষ্টি হবে, পাঠক মেতে উঠবেন নতুন সাহিত্যিকদের রচনায়, কিন্তু এঁদেরকে আর পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে না এঁদের নতুন রচনা। কিন্তু এঁদের যতটুকু অবদান, তা কখনো ম্লান হওয়ার নয়। আমাদের ভবিষতের প্রেরণা হয়ে থাকবে তাঁদের সৃষ্টি।  আমাদের স্মৃতিতে ও পাঠে থাকবেন তাঁরা।