কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল খুবই ইন্টারেস্টিং। আমি আমার একেবারে শৈশব থেকে তাঁর স্নেহ-সান্নিধ্যে বিকশিত হয়েছি। অধিকাংশ সময়েই তাঁর কাছে আমি ছিলাম সন্তানের মতো। কিন্তু কখনো কখনো আমি আমাদের সম্পর্ক আর বয়েসের ব্যবধানটা ঘুচিয়ে ফেলে হয়ে উঠতাম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। আমাদের দুজনের প্রধান কাজ লেখালেখি বলেই অসমবয়েসি আমরা দুজন প্রায়ই সমসাময়িক কালের দুজন লেখক হিসেবে পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারতাম দ্বিধাহীন। তখন আমি ভুলে যেতাম সম্পর্কে তিনি আমার খালাম্মা হন। এবং তিনিও ভুলে যেতেন আমি তাঁর পুত্রবত্। তখন আমাদের আলোচনায় উঠে আসত জীবনের হাসি আনন্দ সুখ দুঃখের নানান উপাখ্যান। উঠে আসত মানব-মানবীর জটিল সম্পর্কের নানান মোচড়। উঠে আসত জীবনের প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য গোপন গলিঘুপচির আলো-অন্ধকারগুলোও।
আমাকে তিনি প্রশ্ন করে করে আমার মাধ্যমে জেনে নিতেন তাঁর প্রায় দুই প্রজন্ম আগের একজন পুরুষের জীবনদৃষ্টি। আমার ব্যক্তিজীবন। আমার দাম্পত্য জীবন। আমার প্রেম। আমার অভিমান। আমার সংগ্রাম। আমার জেদ—সব, সবকিছু। আমার স্ত্রী শার্লির সঙ্গে আমার একজীবনের ভালোবাসার গল্পও তিনি শোনেন গভীর অভিনিবেশ নিয়ে। জানতে চান প্রবাস জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতগুলো। প্রবাসের তরুণ-তরুণীদের মুক্ত স্বাধীন জীবনযাপনের সুফল আর কুফলগুলো। তিনি নিজে প্রায় সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন। নিজের চোখেই দেখেছেন বহুকিছু। তারপরেও আমার কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেন। মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন তাঁর দেখা আর আমার দেখাকে। ভিন্ন বয়েসি আমাদের দুজনের উপলব্ধির মিল-অমিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ করেন। একজন প্রকৃত লেখক তো সেটাই করে থাকেন। নিজের উপলব্ধিটা লেখেন ঠিকই, কিন্তু অন্যের উপলব্ধিকেও মাথায় রাখেন।
কত স্মৃতি খালাম্মার সঙ্গে! কক্সবাজার সি বিচ, চান্দের গাড়ি, ইনানি বিচ, বগুড়া এফ কটেজ, কলকাতা বইমেলা, কলকাতা গ্র্যান্ড হোটেল সুইমিংপুল লবি, ব্যাংকক হসপিটাল—কোনটা রেখে কোনটা বলি। একটি মাত্র রচনায় সেগুলো লেখা সম্ভবও নয়। তবে যেখানেই গেছি আমার কথাবার্তা আর পাগলামি দেখে খালাম্মা তো হেসেই গুঁড়োগুঁড়ো হয়েছেন বারবার, প্রতিবার। আমি হাসিখুশি থাকি বলে আমার সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন।
বছর তিন আগে, ২০১৭ সালে, নিজের বইয়ের লেখক সম্মানীর টাকার ভাগ দিয়েছিলেন তিনি প্রত্যেক সন্তানকে। ফরিদুর রেজা সাগরকেও। একটা ভাগ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আমাকেও। রাবেয়া খাতুন নামাঙ্কিত খামের ওপর আমার নামটি লিখলেন। তারপর সেই খামটা একজন বাহকের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন চ্যানেল আইতে, আমার কাছে। খাম খুলে দেখি ভেতরে কয়েকটা চকচকে নোট, পাঁচশ টাকার। ফোন দিলাম তাঁকে। খালাম্মা বললেন, এটা তোমার। আমার বইয়ের রয়্যালিটির টাকা। সাগর-কেকাদের সবাইকেই দিয়েছি। তুমি এটা খরচ কোরো।
একজীবনে কত কত স্মৃতি বর্ষীয়ান কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে!
২০১০ সালে খালাম্মার সঙ্গে বগুড়ায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি যাওয়া হলো। বগুড়া টিটো হলে রাবেয়া খাতুন আর ফরিদুর রেজা সাগরের সংবর্ধনা ছিল সেবার। ঢাকা থেকে বড়সড় একটা দল ছিল সেই যাত্রায়, তাঁদের সঙ্গে। অনুষ্ঠান বিকেলে।
সকালবেলায় খালাম্মা আমাকে নিয়ে গেলেন ‘এফ কটেজ’ নামের শান্তস্নিগ্ধ একটি বাড়িতে। বিয়ের পর স্বামী ফজজুল হকের (বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ‘সিনেমা’র সম্পাদক এবং প্রথম ছোটদের চলচ্চিত্র ‘প্রেসিডেন্ট’-এর পরিচালক) সঙ্গে এই বাড়িটিতেই এসে উঠেছিলেন কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন। এটা তাঁর শ্বশুরবাড়ি। এই বাড়ির প্রতিটি ইট-সুড়কি-গাছ-পাথরের সঙ্গে খালাম্মার প্রথম যৌবনের সহস্র স্মৃতি মিশে আছে। অনেক আবেগ আর উচ্ছ্বাসের তোড়ে ভাসতে ভাসতে খালাম্মা আমাকে দেখালেন—এই ঘরটায় হয়েছিল আমাদের প্রথম বাসর। সাগরের জন্ম এখানেই। তারপর ভেতর বাড়ির প্রশস্ত বারান্দায় নিয়ে গিয়ে দেখালেন—সকালবেলায়, ঠিক এই জায়গাটায় নারকেল গাছের চিরল চিরল পাতার ফাঁক গলে রোদ আসত প্রচুর। সেই রোদে সাগরকে এখানে আমি গোসল করাতাম।
আমি জানতে চাইলাম—বাড়ির নাম ‘এফ কটেজ’ কেন? খালাম্মা বললেন—সাগরের বাবা ফজলুল হক, ওর দুই চাচা ফজলুল করিম আর ফজলুল আলম। সবার নামের প্রথম অক্ষর এফ। সেই বিবেচনায় সাগরের বাবা বাড়িটার নাম দিয়েছিলেন ‘এফ কটেজ’।
ফজলুল হকের ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। নিজের দুই পুত্রকেও তিনি এফ এলফাবেটের আওতায় রেখে ‘এফ কটেজ’ভুক্ত করেছেন—ফরিদুর রেজা আর ফরহাদুর রেজা।
স্মৃতি হিসেবে এফ কটেজের ছোট্ট সেই নামফলকটিই এখনো যত্ন করে ঝুলিয়ে রাখা আছে বাড়ির একটি অংশে। খালাম্মা আমার হাত ধরে নিঃশব্দে সেই বাড়ির এইঘর সেইঘর, এই বারান্দা সেই বারান্দা, এই দরোজা সেই দরোজা, এই জানালা সেই জানালার কাছে ঘুরে ঘুরে এলেন কয়েকবার। আমি জানি ঠিক ওই সময়টায় খালাম্মা তাঁর প্রথম যৌবনের আনন্দের প্লাবনে ভেসে যাওয়া দিন আর রাত্রিগুলোর অনিঃশেষ সৌরভকে অনুভব করছিলেন তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাস আর চোখের পাপড়ির প্রতিটি কম্পনে। আমি চুপ করে ছিলাম। অহেতুক কথা বলে আমি খালাম্মার নীরবতার সৌন্দর্যটুকু নষ্ট করিনি একটুও।
কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুন, প্রিয় খালাম্মা, সারাটা জীবন আপনি কত কষ্টই না করেছেন। তরুণী থাকা অবস্থায় চার চারটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে একলা একা পাড়ি দিয়েছেন জীবনের দীর্ঘ-দীর্ঘতম পথ। সেই পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। কিন্তু অনটন-ক্লান্তি-অবসাদ-না পাওয়ার বেদনা কোনোকিছুই আপনাকে টলাতে পারেনি, পারেনি থামিয়ে দিতে। জীবন আপনার সঙ্গে কানামাছি খেলতে চেয়েছে। উলটো জীবনকে নিয়ে আপনি কানামাছি খেলেছেন নিরন্তর।
আপনার অসংখ্য গল্প-উপন্যাসের শত সহস্র মুদ্রিত পৃষ্ঠা মুহুর্মুহু আপনাকে জয়ী ঘোষণা করছে।
শান্তিময় হোক আপনার অনন্তযাত্রা।
