শীত গেলেই অভাব ফিরে আসে তাঁতিদের ঘরে

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ০৭:৫৫

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কেশুরবাড়ি এলাকার তাঁতপল্লি একসময় ৫০০ তাঁতের খট খট শব্দে মুখরিত থাকলেও এখন তা বন্ধের পথে। পৈতৃক পেশা ছাড়তে না পাড়ায় ধারদেনা করে কোনোভাবে টিকে রয়েছে তাঁতিরা। গত বছর এ সময়ে কম্বল কিনতে পাইকাররা তাঁতপল্লিতে ভিড় করলেও এ বছর পাইকারদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। 

তাঁতপল্লির কারিগর সচিন জানান, ‘শীতের দিন কম্বল বিক্রি হামার (আমাদের) সংসার ভালোই চলে। কিন্তু শীত যখন চলে যায় তখন কীভাবে চলিমো (চলবো) চলার মতো বুদ্ধি আর থাকে না। তখন কাহ (কেউ) ঢাকাই গিয়া (গিয়ে) রিকশা চালাই। কাহ (কেউ) দুরত (দূরে) গিয়ে ভাটায় কাম (কাজ) করে। এভাবে সংসার চালানো ধায়ফাই (কঠিন) হয়ে পরে। তখন দেনা মাহাজান (ঋণ) বেশি হয়ে যায়। পরে আবার শীত আসে। তখন করি কী, সুতা নিয়ে আসে আবার কম্বল তৈরি করে বিক্রির টাকা মহাজনের ঋণ পরিশোধ করি। তখন ঘুরিফিরে শীতও গেল, আবার অভাবও ফেরত (ফিরে) আসিল।’

সরেজমিনে জানা যায়, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখানকার ৫০০ পরিবারের প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ বংশানুক্রমে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তারা আগে শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি করলেও বর্তমানে শুধু কম্বল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই দুই/তিনটি করে তাঁত রয়েছে। এর কোনোটা চাকাওয়ালা, আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি। রবিন নামে এক তাঁতি বলেন, গত বছর ৪০ কেজি সুতার দাম ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। এবার সেই সুতার দাম ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। ৪০ কেজি সুতায় দিয়ে ২০-২২ টি কম্বল তৈরি হয়। কম্বল বিক্রি করে কোনোভাবে আসল টাকা পাওয়া যায়। প্রতি বছর লোকসান হচ্ছে। 

লোকসানে এলাকার শিবু, টিপু, চন্দনসহ অনেক তাঁতি বাড়িছাড়া হয়েছেন। এখন বাজারে কম দামের ব্লে­জারের কম্বল আসার কারণে আমাদের কম্বল নেওয়া হয় না। প্রবীণ তাঁত কারিগর ধনেশ চন্দ্র বর্মণ দুঃখ করে বলেন, সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করত তাহলে সারা বছর আমরা তাঁতের কাজ করতে পারতাম। মালী রানী নামে এক নারী বলেন, অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সঠিক মজুরি পাচ্ছি না। অন্য কাজ করতে পারি না। সেজন্য এখন কম্বল তৈরি করি। ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারিভাবে সুযোগ সুবিধা দেওয়াসহ তাদের কম্বল বাজারজাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ইত্তেফাক/কেকে