ভাঙছে ধরলার পাড়, বসতভিটা ছাড়ছেন একের পর এক পরিবার

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৬, ১০:০১

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার চর-গোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। গত এক সপ্তাহে তীব্র ভাঙনে অন্তত চারটি পরিবার বসতভিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এবং প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুজিব কেল্লা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ধরলার আগ্রাসী ভাঙনে ইতোমধ্যে শত শত বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নতুন করে পানি বৃদ্ধির পর ভাঙনের গতি আরও বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবার আগাম ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে নতুন করে ঘর নির্মাণের সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

নদীভাঙনের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন দিনমজুর মজনু সরকার (৪৮) ও তার স্ত্রী চাঁনবানু বেগম। একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে জমিজমা হারানোর পর এবার শেষ সম্বল বসতভিটাটুকুও হারানোর আশঙ্কায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।

মজনু সরকার বলেন, ‘এই বয়সে পাঁচ-ছয়বার নদীভাঙনের শিকার হয়েছি। জমিজমা সব নদী গিলে খেয়েছে। এখন শুধু বসতভিটাটুকু ছিল, সেটাও নদীর মুখে। বাধ্য হয়ে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু নতুন করে ঘর তোলার মতো টাকা নেই। কীভাবে পরিবার নিয়ে বাঁচব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।’

চাঁনবানু বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘চারদিকে শুধু পানি আর পানি। আরও পানি বাড়লে ঘরেও ঢুকে যাবে। দিনভর কোনো রকমে থাকলেও রাতে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। কখন ভাঙন এসে ঘরটা নিয়ে যায়, সেই ভয়েই ঘুমাতে পারি না। আমাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বামীর বয়স হয়েছে, আগের মতো কাজ করতে পারেন না। আমি দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালাই। সারাদিন পরিশ্রম করে বাড়ি ফিরে যদি নিজের ঘরেই নিরাপদে থাকতে না পারি, তাহলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে? এখনই ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে হয়তো শেষ সম্বল এই ভিটাটুকু রক্ষা পাবে।’

একই এলাকার বাসিন্দা জহুরুল হক ও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম জানান, নদীভাঙন তাদের বাড়ি থেকে মাত্র ২০ গজ দূরে চলে এসেছে। যেকোনো সময় তাদের বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে আরও বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।

চর-গোরকমন্ডল ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়াজ উদ্দিন বলেন, মজনু সরকার ও চাঁনবানু বেগমের মতো কয়েকটি পরিবার ইতোমধ্যে ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। গত এক বছরে প্রায় শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নিঃস্ব হয়েছে। কেউ সরকারি আবাসন প্রকল্পে, কেউ অন্যের জমিতে, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তিনি আরও বলেন, নতুন করে পানি বৃদ্ধির ফলে গত এক সপ্তাহ ধরে ধরলা নদীতে তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবার ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মুজিব কেল্লাও নদীভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা এবং স্থায়ী নদীরক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, চর-গোরকমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙন রোধে এক সপ্তাহ আগে দুই হাজার জিওব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যদি এখনো কাজ শুরু না হয়ে থাকে, তবে দ্রুত কাজ শুরু করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে আরও জিওব্যাগ সরবরাহের ব্যবস্থাও করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি