ঢাকা শ্রোতারা শুনতে পেলেন মধ্য ইউরোপের সুর। পোল্যান্ডের খ্যাতিমান লোকগানের দলটি কুর্দি, বেলারুস, ইসরায়েল অঞ্চলের সুরকে তুলে ধরলেন বাংলাদেশের শ্রোতাদের সামনে। ভারতের পাঞ্জাবের ওয়াদালি ব্রাদার্স সুফি ঘরানার গানে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়ার অনুভূতি ছড়িয়ে দিলেন। এমনি করেই বাংলার লোক গানের সঙ্গে ইউরোপ ও পারস্যের মেলবন্ধন ঘটলো ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে।
প্রকৃতি থেকেই লোক সংগীতের উত্পত্তি। বিস্তীর্ণ চরাচর, ধূ ধূ মাঠ, ফসলের ক্ষেত, রাঙা ধুলোয় মোড়া মেঠো পথের পরতে পরতে মিশে আছে বাংলার গান। মিশে আছে এই বাংলার মানুষের মনে। শুধু বাংলা কেন পৃথিবীর সব দেশেই লোক সংগীত মাটি থেকে উত্সারিত। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের লোকগানকে এক সুঁতোয় বেঁধেছে আন্তর্জাতিক লোক সংগীত উত্সব। সান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে চতুর্থবারের মত আয়োজিত এ উত্সবে বাংলাদেশসহ সাত দেশের দেড়শতাধিক শিল্পী অংশ নিচ্ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কাজের ব্যস্ততা, অবসর ও নির্জনতার অনুভূতি মিশে আছে আমাদের গানে। আর্মি স্টেডিয়ামে হেমন্তের কুয়াশার মাঝে লোক সংগীতের আসরে মানুষ যেন নিজের শেকড়ের গানের টানে ছুটে এসেছিলেন। যে গান আমাদের অস্তিত্বে মিশে রয়েছে। সেই লোক গানকে নিয়ে এই বিশাল আয়োজনে মানুষ দর্শক-শ্রোতারা এসেছিলেন দল বেঁধে।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোক নাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় উত্সব। ভাবনা নৃত্যদল পরিবেশন করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ণিল নাচের উপস্থাপনা বর্ণময় করে তোলে উত্সব মঞ্চ। ‘সোহাগ চাঁদ বদনি ধনী নাচ তো দেখি’ এ গানের সঙ্গে নৃত্য দিয়ে শুরু করে শিল্পীরা। এরপরে পাহাড়ি নৃত্য, রাঁয়বেশে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা। সামিনা হোসেন প্রিমার পরিচালনায় নৃত্যদল ভাবনার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সবের চতুর্থ আসর। সান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও সান কমিউনিকেশনের আয়োজনে মেরিল নিবেদিত এ আয়োজনে সহযোগিতা করছে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড, গ্রামীণফোন ও রাঁধুনী।
লোকসংগীত সমকাল থেকে অনুপ্রাণিত হয় কিন্তু তাকে অনুসরণ করে না। লোকসংগীতের উপমা, বর্ণনার ভঙ্গি সবসময় আধুনিক। সে কারণেই এ গান বহতা নদীর মত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। গতকাল প্রথম দিনের দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের শিষ্য নারায়ণগঞ্জের আবদুল হাই দেওয়ান। গুরু তাকে উপাধি দিয়েছেন ‘হাফ মাতাল’ এই উপাধি নিয়েই গানে গানে মানুষের মন রাঙিয়ে তুলছেন তিনি। গতকালও বাউল গানে মাতালেন উত্সব মঞ্চ। তিনি গেয়ে শোনান ‘মা গো মা - জি গো জি/ পড়লাম কি রঙ্গে/ ভাঙ্গা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’, ‘তুই বড় রঙ্গিলা বাওয়াইরে, বাওয়াই কতই জাদু জানো’, ‘বাজার ভালো না গো বন্ধু, বাজার ভালো না’, ‘কোনো বা দেশে রইলা দয়াল’, ‘বন্ধু রে তোর জ্বালায় বাঁচি না’ ও তোমারও লাগিয়া রে বন্ধু’।
এরপরে ছিল সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, সান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী, ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, গ্রামীণফোনের ডেপুটি সিইও ও সিএমও ইয়াসিন আজমান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতিগতভাবেই বাংলার লোকসংগীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যের দিক থেকেও অন্যদের তুলনায় বিশেষভাবে উন্নত। বর্তমান সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে লোকসংগীত পেয়েছে নতুন মাত্রা। তাই দেশ ও দেশের বাইরে লোকসংগীতকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং বাংলার তৃণমূল পর্যায় থেকে শেকড়ের শিল্পীদের তুলে আনার এক যুগান্তকারী সংযোজন “ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোকফেস্ট”।
আসাদুজ্জামান নূর বলেন, মানুষ, প্রকৃতি, পৃথিবী, শেকড়ের রস এসবই আমাদের লোকসংগীতের উপকরণ। লোকসংগীতের এই উত্সবে তারুণ্যের স্রোত আমাকে অভিভূত করেছে। লোকসংগীতের জয় হোক, তারুণ্য ও যৌবনের জয় হোক।
সাঈদ খোকন বলেন, বাংলাদেশের লোকসংগীতের এই উদ্যোগ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক। লোকসংগীতের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে নতুন করে চিনুক এটাই এই উত্সবের কাছে আমার প্রত্যাশা।
অঞ্জন চৌধুরী বলেন, আমাদের লোকসংগীত আমাদের ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বও আমাদের। সংগীতের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই তিনদিনের এই লোকসংগীত উত্সবের আয়োজন।
প্রথম দিনেই পোল্যান্ডের লোকগানের দল দিকান্দা প্রথমবারের বাংলাদেশে পরিবেশনায় অংশ নেয়। বলকান এবং জিপসির প্রভাব থাকা মধ্য ইউরোপের এ দলটি গানের তাল আর লয়ের দিয়ে বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের হূদয় জয় করে নিয়েছে। দিকান্দা ব্যান্ডটি তাদের প্রতিটি গানের শব্দের মাঝে তৈরি করে নিজস্ব লোকজ শব্দ যা সবার কাছে ‘দিকান্দিশ’ নামে পরিচিত। এ ব্যান্ডের শিল্পীরা হলেন গায়িকা আনিয়া উইটযাক ও কাসিয়া বগুশ, পারকাশন বাজিয়েছেন দানিয়েল কাচমারজিয়েক, ক্লাসিক্যাল গিটার বাজিয়েছেন পিওত্র রেইদাক, ডাবল বেসে ছিলেন জেগরজশ কলব্রেচকি, ট্রাম্পেট বাজান সিমন বব্রস্কি আর ভায়োলিনে ছিলেন আন্দ্রে ফিস ইয়ারজাবেক।
গায়িকা আনিয়া উইটজাক ভাঙা বাংলায় কয়েকবার বাংলাদেশের দর্শকদের প্রতি তার ভালোবাসা জানান। বলেন, গানের ভাষা ছিল তাদের নিজস্ব কিন্তু ভাবগুলো চিরায়ত। উইটজাক গানে গানে বলছিলেন দুঃখ বেদনার কথা। আবার কখনো বলছিলেন, আমরা আমাদের পরিবারকে ভালোবাসি। স্বামীকে, স্ত্রীকে, সন্তানদেরকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসার মধ্য দিয়েই আমরা বেঁচে থাকতে চাই, বাঁচি। আসুন সেই ভালোবাসায় অবগাহন করি সুরে সুরে। তারপরই আবার শুরু গান।
এরপর আসেন কোক স্টুডিওতে লালন গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা শিল্পী ভারতের সাত্যকী ব্যানার্জী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাংলাদেশে এসেও পৌঁছেছে তার জনপ্রিয়তার রেশ।
ভারতের পাঞ্জাবের ওয়াদালি ব্রাদার্স সুফি ঘরানার এক ভিন্ন পরিবারের সদস্য। বংশের পঞ্চম পুরুষ হিসেবে ওস্তাদ পূরণচন্দ্র ওয়াদালি ও পেয়ারেলাল ওয়াদালি ভ্রাতৃদ্বয় ভারতের সুফি সংগীতে সমাদৃত। পেয়ারেলাল ওয়াদালি এ বছরের ৮ মার্চ মারা যাওয়ার পরও দলটির নাম পরিবর্তন হয়নি। তার বদলে দলে যোগ দিয়েছেন পূরণচন্দ্র ওয়াদালির ছেলে লক্ষ্মিণদার ওয়াদালি। গান তাদের কাছে শুধু সুরের সাধনা নয় বরং ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাবার মাধ্যম। তাই গানে গানে ঈশ্বরের সন্ধান করেন শিল্পীরা। সেই নিবেদন ফুটে উঠলো শিল্পীদের গানে। গতকালকের সর্বশেষ পরিবেশনায় মঞ্চে এসে শিল্পীর বুল্লে শাহ্, ফরিদ সাহেব জ্বি, শাহ্ হুসেইন জি’র ভজন গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন। তার পরিবেশনার মধ্য দিয়েই প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয়।
তারা একে একে গেয়ে শোনান ‘তুঝে দেখা তো লাগা মুঝে অ্যায়সে, জ্যায়সে মেরি ঈদ হো গ্যায়ি’, ‘ম্যায় তো পিয়াসে ন্যায়না লাগা আয়ি রে’সহ তাদের জনপ্রিয় বেশ কিছু গান।
আজকের উত্সবসূচি : আজ শুক্রবার উত্সবের দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা উপস্থাপন করবে লোকগানে বাংলার অহংকার মমতাজ বেগম এবং লোকগানের দল স্বরব্যঞ্জন। এদিন আরো গাইবেন ভারতের দ্য রঘু দিক্ষিত প্রজেক্ট, যুক্তরাষ্ট্রের লস টেক্সমেনিয়াক্স এবং বাহরাইনের মাজাজ।
বরাবরের মতো এবারও ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উত্সব সরাসরি সম্প্রচার করবে মাছরাঙা টেলিভিশন। এছাড়াও গ্রামীণফোনের অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস ‘বায়োস্কোপ লাইভ’-এ অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখার সুযোগ থাকছে।
