অব্যবস্থার উদাহরণ মাত্র

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৭

সচিত্র প্রতিবেদনটি ছাপা হইয়াছে একটি সহযোগী দৈনিকে। চাঁঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার বরদিয়া গ্রামে অতীব জরাজীর্ণ বহু বছরের পুরাতন ছোট্ট একখানি টিনের ঘর। খসিয়া পড়িয়াছে মরিচাধরা নষ্ট টিনগুলি। কোনোক্রমে খুঁটির সঙ্গে জড়াইয়া আছে ঐ টিন। উহার ভিতরে রহিয়াছে পুরানা একখানি বাক্স, একখানা পুরাতন টেবিল ও একখানা পুরাতন চেয়ার। উন্নয়নের বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো গরু-ছাগলের খোঁয়াড়ও এইরূপ ভগ্নদশা পাওয়া যাইবে না। অথচ উহা একটি পোস্ট অফিস! তাহা লইয়াও বিশেষ কোনো কথা ছিল না, যদি জানা না যাইত যে উহা একটি ডিজিটাল পোস্ট অফিস! অর্থাত্ সরকারিভাবে উহা ডিজিটাল পোস্ট অফিস বলিয়া খাতা-কলমে লিপিবদ্ধ। ৪০ বত্সর ধরিয়া মাস্টাররোলে কর্মরত আছেন একজন পোস্টমাস্টার কেরামত আলী। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, তাহার অবস্থাও ঐ খুপরি ঘরটির মতোই। তিনিই জানাইয়াছেন, সরকার ঐ পোস্ট অফিসের জন্য তিনটি ল্যাপটপ, একটি লেজার প্রিন্টার, একটি কালার প্রিন্টার, একটি স্ক্যানারসহ আরো কিছু উপকরণ বরাদ্দ দিয়াছেন, কিন্তু তিনি তাহা চোখেও দেখেন নাই! আমাদের প্রশ্ন হইল, যদি ডিজিটাল বলিয়া গণ্য করা হয় তাহা হইলে ডিজিটাল উপযোগী ঘর নাই কেন? আর যদি ঘরের অবস্থা এইরকম করুণ হয়, তাহা হইলে উহাকে ডিজিটাল বলার হেতু কী? কোথায় কী অবস্থায় বরাদ্দকৃত সরঞ্জামাদি রহিয়াছে তাহার জবাবই-বা পোস্ট মাস্টারের নিকট থাকিবে না কেন? 

আমরা জানি, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সরকারের ডাকসেবামূলক ব্যবস্থা বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছাইয়া পড়িয়াছে।  এই অসংগতি, এই ধরনের অব্যবস্থা কেবল ডাক বিভাগে নহে, আমরা প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সর্বক্ষেত্রেই কমবেশি দেখিতে পাই। কোথাও হয়তো একটি স্কুল রহিয়াছে, যাহার শিক্ষার্থীসংখ্যা শতাধিক অথচ শিক্ষক দুই জন। আবার কোথাও ছয় বা আট জন শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক ছয় জন। ব্যয়বহুল হাসপাতাল গড়িয়া তোলা হইয়াছে কিন্তু চিকিত্সক নাই, অ্যাম্বুলেন্স আছে তাহার চালক নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। টেন্ডার হইয়াছে দীর্ঘদিন পূর্বে কিন্তু কাজ শুরু হয় নাই; সামান্য কাজ করিয়া শতভাগ বিল তুলিয়া লওয়া হইয়াছে। এই সকল অসংগতির সংবাদ আমরা প্রতিনিয়ত দেখিতে পাইতেছি। 

এই ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের একটি দায় আছে, যাহা অস্বীকার করা যাইবে না। দেশের প্রত্যেক ইউনিয়নে ১২ জন সদস্য এবং একজন চেয়ারম্যান রহিয়াছেন। তাহার উপর রহিয়াছে উপজেলা পরিষদ। সেই সঙ্গে প্রতিটি দপ্তরের বা বিভাগের মাঠ পর্যায়ে হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন স্তরে কর্মচারী-কর্মকর্তা রহিয়াছেন সরকারের বেতনভুক্ত। কিন্তু মনে হয় যেন অধিকাংশই চোখ বুজিয়া কর্মস্থলে যাতায়াত করেন! স্থানীয় প্রতিনিধিদের মধ্যে যেই সকল এলাকায় এই ধরনের অব্যবস্থা দেখা যায় তাহারা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিতে পারেন,  লিখিত আকারে জানাইতে পারেন। কিন্তু সেই উদ্যোগ কেহ গ্রহণ করেন বলিয়া মনে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বোঝেনই না যে এই ব্যাপারে তাহার দায় রহিয়াছে এবং কথা বলিবার অধিকার রহিয়াছে।

ধীরে হইলেও এই সকল সমস্যা ভবিষ্যতে থাকিবে না বলিয়াই আমাদের আশা। কারণ স্বাধীনতার পরপরই আমাদের অবকাঠামো, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা কী ছিল আর আজকে তাহা কতটা পরিবর্তন হইয়াছে তাহা পুনরুল্লেখের প্রয়োজন নাই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে যত সচেতনতা বাড়িবে, এই ধরনের অব্যবস্থাগুলি তত দ্রুত সমাধান হইবে। তাই কি জনপ্রতিনিধি আর কি সাধারণ নাগরিক, প্রতিটি পর্যায়ে সচেতন হইতে হইবে; কথা বলিতে হইবে, সোচ্চার হইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, কেন একটি ডিজিটাল পোস্ট অফিস এই রকম জীর্ণ অবস্থায়, কেন একটি উন্নয়ন কাজ পড়িয়া আছে, কেন একটি হাসপাতাল হইবার পর তাহার প্রয়োজনীয় চিকিত্সক নাই তাহা জানিবার এবং জানাইবার অধিকার সকলের আছে।