ওয়ার্ক কালচার

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৮

কোনো এক অফিসের কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনাদের অফিসে কত জন লোক কাজ করে? প্রশ্নটা খুবই সরল প্রকৃতির, নিতান্তই সংখ্যাতাত্ত্বিক। বললেই চুকে যেত, ৫০, ৮০ বা ১০০। বড়কর্তা কিন্তু এমন সরল উত্তর দেননি। সাধে কি আর তিনি বড়কর্তা! তিনি বলেছিলেন, তা প্রায় শতকরা ৫০ জন কাজ করেন। মানে দাঁড়াল, তার অফিসে যত জন লোক আছেন, তার অর্ধেক কাজ করেন, বাকি অর্ধেক কোনো কাজ করেন না।

এ কথা জানার পর কেউ হয়তো বলতে পারেন, এই বড়কর্তা অতি ভাগ্যবান ব্যক্তি। এমন অনেক অফিস আছে যেখানে শতকরা ২৫ জন লোকও, মানে এক-চতুর্থাংশ লোক কোনো কাজ করেন না।

অবশ্য এরও ব্যতিক্রম আছে। এমন অনেক অফিস আছে, যেখানে একজনও কোনো কাজ করেন না। কিন্তু সেটা তাদের দোষ তা বলা যাবে না। কার্যকারণবশত সেখানে আসলে জনবল আছে, কিন্তু কোনো কাজ নেই। সরকারি কিছু কিছু অধিদপ্তর, পরিদপ্তরে এমন চিত্র এখনো বিরল নয়। যাদের তেমন কোনো কাজ নেই, কিন্তু অফিস পদ, মাস শেষের বেতনাদি সবই আছে। এমনকি ভালো কাজের জন্য এখানে প্রমোশনও হয়!

ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে ‘মাংকি অফিসার’ নামে একটি পদ ছিল। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন বানরের অফিসার। না, বানরের দেখাশোনা, পরিবার-পরিকল্পনা, পুনর্বাসন—এসব ঐ কর্মকর্তার কাজ ছিল না, তিনি ছিলেন আসলে ‘বানর সংহার অফিসার’। শস্যখেতে বা জনপদে কোথাও অতিরিক্ত বানরের উত্পাত দেখা দিলে তার কাজ ছিল ঐ বানরকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে বিনাশ করা। বলা বাহুল্য, কাজ করার সুযোগ ঐ কর্মকর্তার খুব কমই এসেছে।

তাই বলে কি ঐ কর্মকর্তার কোনো কাজ ছিল না? না, তা নয়। প্রত্যেক সপ্তাহে ওপরওয়ালা মারফত হেড অফিসে রিটার্ন পাঠাতে হতো। আগের সপ্তাহে, আগের মাস পর্যন্ত কতগুলো বানর নিধন করা হয়েছে। এ সপ্তাহে বানরের অত্যাচারের খবর কতগুলো এসেছে। এ সপ্তাহে কতগুলো বানর মারা গেছে, বা কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, এই রকম চতুর্দশপদী রিটার্ন।

স্বাভাবিক কারণেই ঐ অফিসার জিরো রিটার্ন পাঠাতেন, মানে সবই শূন্য, শূন্য। ঐ অফিসারের ওপরওয়ালারা চোখ বুজে আরো ৫০টা সাপ্তাহিক রিটার্নের সঙ্গে সেটার নিচেও একটা সই করে দিতেন। সেই রিটার্ন হেড অফিসে যেত। কোনোটার রিটার্ন পাঠাতে গাফিলতি হলে কখনো কখনো মাস তিনেকের মধ্যে রিমাইন্ডার আসত। কালেভদ্রে গুরুতর গাফিলতি হলে অর্থাত্ একাধিকবার রিটার্ন না গেলে হেড অফিসের বড়সাহেব ডেমি-অফিশিয়াল চিঠি দিয়ে হুমকি দিতেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের গাফিলতি আর বরদাস্ত করা হবে না।’

দুঃখের বিষয়, কেউ কখনো খতিয়ে দেখতেন না ব্যাপারটা কী, কীসেরই বা রিটার্ন।

আমাদের দেশে এখনো সেই ধারা চলছে। এখানে সবাই কাজ করছে, ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা হচ্ছে না। যতটুকু কাজ করে যেখানে পৌঁছানোর কথা, আমরা সেখানে যেতে পারছি না। আসলে কাজ করাটাই সব কথা নয়, কাজটা সঠিক কাজ কি না, সেটাও বিবেচনা করা দরকার। ডিসেম্বর মাসে কেউ জীবিত থাকলে সে নভেম্বর বা অক্টোবরেও জীবিত ছিল, এর প্রমাণ চাওয়ার সমস্যা শুধু পেনসন অফিসেরই নয়, সব অফিসেই অল্পবিস্তর রয়েছে।

এমনিতেই আমাদের দেশের ওয়ার্ক কালচারের অবস্থা ভালো নয়। দেরি করে অফিসে আসা, অফিসে এসে সময়ের কাজ সময়ে না করা, গল্পগুজব-আড্ডা দিয়ে সময় পার করা, নানা অজুহাতে ছুটি ভোগ করা ইত্যাদি নানাভাবে কাজে ফাঁকি দেওয়ার একটা বদনাম চাকরিজীবীদের আছে। করোনা মহামারি এই ওয়ার্ক কালচারকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। অনেকে ঘরে বসে অফিসের কাজ করার নামে চূড়ান্ত ফাঁকি দিচ্ছেন। অনেকের ঘাড়ে কয়েক গুণ বেশি বোঝা চেপেছে। অনেকে ঢিলেঢালাভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে করোনাকালে আমাদের ওয়ার্ক কালচারে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিয়েছে এবং সেটা নেতিবাচক। 

ওয়ার্ক কালচার বা কর্মসংস্কৃতি বলতে আমরা যেটা সচরাচর বুঝে থাকি, তার অনেকটাই নির্ভর করে সরকারি অফিসে আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যা বেশ খারাপ। তার সঙ্গে অন্যদের অভিজ্ঞতার মিশেল ঘটিয়ে আমরা একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর চেষ্টা করি বাংলাদেশে কর্মসংস্কৃতি ভীষণ খারাপ, কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠানে তা একটু ভালো হলেও হতে পারে। এই ধারণা নিশ্চয়ই অহেতুক নয়। সত্যিই তো, সরকারি কর্মচারীদের একটা বড় অংশ কাজে খুব অবহেলা করেন, সিটে থাকেন না, অফিসে ব্যাগ রেখে বেরিয়ে যান ব্যক্তিগত কাজে, দীর্ঘদিন ফাইল আটকে রাখেন, কোনো প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেন না, প্রচুর ভুল করেন এই রকম অভিযোগ ঝুড়ি-ঝুড়ি।

কিন্তু এ দেশেই আবার অনেক সরকারি অফিস আছে, যেখানে দক্ষ কর্মচারী আছেন এবং তারা পরিশ্রম করতে সদাই উন্মুখ, অথচ প্রায় কোনো কাজ নেই। অনেক জায়গায় আবার অতিরিক্ত জনবলের সমস্যা। তবে ওয়ার্ক কালচার কার্যকর করতে বিশ্বের নানা জায়গায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বিলাতের কথাই ধরা যাক। সেখানে কর্মসংস্কৃতি ফেরাতে কিছু দিন আগে একটি বৃহত্ সরকারি সংস্থায় কাজের ধরন অনুযায়ী ছোট ছোট দল তৈরি করা হয়। ছোট দলে কাজ করার অসুবিধে হলো, এখানে ফাঁকি ধরা পড়ে চট করে এবং অন্যের ঘাড়ে কাজের ভার চাপিয়ে পালিয়ে যাওয়া যায় না। এর সঙ্গে দলের উত্পাদনশীলতার ওপর ভিত্তি করে কিছু ‘ইনসেনটিভ’-এর বন্দোবস্ত রয়েছে। এই পদ্ধতিতে সেই সরকারি দপ্তরটির উত্পাদন বেড়েছে বেশ কয়েক গুণ।

আমাদের দেশেও কিছু কিছু দপ্তর ও করপোরেট হাউজে ওয়ার্ক কালচার উন্নত করতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য তত্পর ও উদ্যোগী কর্মকর্তা প্রয়োজন। অফিসের বড়কর্তা যদি উদ্যোগী হন, তাহলে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তনই সম্ভব। তবে সদা তত্পর হলেই ওয়ার্ক কালচার উন্নত করা যায় না। এ ব্যাপারে এক পোস্ট অফিসের ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে। যেমন হয়, এক কাউন্টারে এক ভদ্রলোক কিছু বলছেন। তার জবাবে কাউন্টারে কর্মরত কেরানি সাহেব বললেন, ‘না, নেই। মাসখানেক ধরে নেই।’

এই কথা সদ্য যোগদান করা তত্পর পোস্টমাস্টার সাহেবের কানে যেতে তিনি ছুটে এসে সেই ভদ্রলোককে বললেন, ‘না, আছে। আপনি ঐ নয় নম্বর কাউন্টারে যান, ওখানে পাবেন।’

পোস্টমাস্টার সাহেব ভেবেছিলেন, বেশ কিছু দিন পোস্টকার্ডের অভাব যাচ্ছে, ঐ ভদ্রলোক হয়তো পোস্টকার্ডের খোঁজ করছেন।

আসলে ঐ ভদ্রলোক অন্য এলাকার মানুষ। পোস্ট অফিসে টিকিট কিনতে এসে কথায় কথায় বলছিলেন, এখানে বৃষ্টি হচ্ছে কি না। তারই জবাবে কেরানি সাহেব জানান, ‘না চার সপ্তাহ নেই।’

সুতরাং এবার যখন পোস্টমাস্টারের কাছে জানতে পারলেন, ৯ নম্বর কাউন্টারে বৃষ্টি আছে, তিনি একটু অবাক হলেও কারো কিছু করার ছিল না!

অফিসের বস যদি কড়া মেজাজের হন, তাহলে দায়িত্ববান ব্যক্তিও অনেক সময় ঝামেলায় পড়তে পারেন। যেমন এক অফিসে এক দায়িত্বসচেতন ব্যক্তি ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন। কখনো অনিয়মিতভাবে অফিস আসেননি। বিনা অনুমতিতে কামাই করেননি। ঠিক ঠাক ৯টার মধ্যে অফিস এসেছেন। সারা দিন ঘাড় গুঁজে কাজ করেছেন। বিকাল ৫টায় অফিস ছুটির পরে বাড়ি রওনা হয়েছেন।

একদিন সেই ভদ্রলোক বেলা সাড়ে ১২টায় এসে অফিসে উপস্থিত হলেন। কিন্তু এ কী চেহারা তার! মাথা ফাটা, কপালে ব্যান্ডেজ, চুল উশকোখুশকো। ছেঁড়া জামাকাপড় ধুলো মাখামাখি। হাত ছড়ে গিয়েছে। কোনোরকমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে তিনি এসে অফিসে পৌঁছলেন।

তাকে দেখে ওপরওয়ালা খেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কী ব্যাপার এত বেলায় সং সেজে কোথা থেকে এলেন?’

ভদ্রলোক কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘আমার কোনো দোষ নেই, স্যার।’

ওপরওয়ালা আবার খেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তা হলে আমার দোষ?’

ভদ্রলোক অনুনয় করে বললেন, ‘স্যার, আমার কথাটা একবার শুনুন।’

ওপরওয়ালা ব্যক্তিটি গম্ভীর হয়ে তাকালেন তার দিকে। সেই জ্বলন্ত দৃষ্টির সামনে থেকে চোখটা নামিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘স্যার, অফিসে আসার জন্য দৌড়ে মিনিবাসে উঠতে গেছি, এমন সময় পেছন থেকে একটা গাড়ি এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিল। অনেক দূরে ছিটকে গিয়ে ফুটপাতের ওপরে পড়ে গিয়েছিলাম, মাথাটা ফেটে গেল, কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেলাম।’

ওপরওয়ালা এত ক্ষণে অস্থির হয়ে পড়েছেন, তিনি হুমকি দিলেন, ‘কথা সংক্ষিপ্ত করুন।’

ভদ্রলোক বলল, ‘বলছি স্যার, আর একটু। রাস্তা থেকে লোকজন ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে ব্যান্ডেজ করল, ইনজেকশন দিল। বুঝতেই পারছেন স্যার।’

অবশেষে ওপরওয়ালা বললেন, ‘তাই বলে এত দেরি?’

তবে আমাদের দেশে ওয়ার্ক কালচার উন্নত করাটা মোটেও সহজ কাজ নয়। অসুস্থ না হয়েও ‘অসুস্থতাজনিত ছুটি’ কাটিয়ে পাকা ডাক্তারি সার্টিফিকেট জোগাড় করে তা উপস্থাপন করার মতো যোগ্য ব্যক্তি আমাদের দেশে খুব কম নেই। কিছু কিছু ওস্তাদ মানুষ আছেন, যারা চাইলে ডেথ সার্টিফিকেট পর্যন্ত দেখাতে পারেন!

পরিশেষে একটি বিখ্যাত কৌতুক। 

বস বলছেন কর্মচারীকে, ‘আপনি কি মৃত্যুর পরের জনমে বিশ্বাস করেন?’

কর্মচারী : ‘জি স্যার।’

বস : ‘হুমম্, করারই কথা। গতকাল আপনি মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর কথা বলে অফিস থেকে ছুটি নেওয়ার পর আপনার মা অফিসে এসেছিলেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে!’

n লেখক :রম্যরচয়িতা