খেজুররসের স্মৃতিকাতরতা

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৮

বস্তুত খেজুরগাছ একধরনের তালজাতীয় শাখাবিহীন বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ড্যাকটিলিফেরা (Phoenix Dactylifera) আর এ বিশ্বে প্রায় ২০ প্রজাতির খেজুরগাছ রয়েছে এবং স্থান, দেশ ও ভাষাভেদে এই ফল নানা নামে অভিহিত, যেমন—আরবিতে তামর, সংস্কৃতিতে পিণ্ড খুর্জরী, হিন্দিতে পিন্ড, ফারসি ও উর্দুতে খোরমা, ইংরেজিতে ডেট (Date), বাংলায় খেজুর ইত্যাদি। উল্লেখ্য যে, মানবসভ্যতার সৃষ্টিলগ্ন থেকে সুমিষ্ট ফল হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার অনেক আগে থেকেই এর চাষাবাদ চলে আসছে। এক্ষেত্রে মেসোপটোমিয়া ও মিশরের আদি নিবাস বলে জানা যায়। এ গাছটি সাধারণত মরু অঞ্চলে ভালো জন্মে। মাঝারি ধরনের গাছ হিসেবে এর গড়পড়তা উচ্চতা ১৫ মিটার থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত। এর লম্বা ও সরু পাতাগুলো পাখির পালকের মতো। আর পাতাগুলো তিন থেকে পাঁচ মিটার লম্বা হয়ে থাকে এবং এর কাঁটাসহ দৃশ্যমান পত্রদণ্ড রয়েছে, যা সর্বসময় নিচের দিকে ঝুলে থাকে। সুমিষ্ট ফল হিসেবে জায়গাভেদে ছোট-বড় হয়ে থাকে। আমাদের দেশে না হলেও মধ্য প্রাচ্যের অন্যতম প্রধান খাদ্য হলো খেজুর। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ উত্তর আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় খেজুর জন্মে। তথাপি উন্নত মানের অধিক খেজুর উত্পন্ন হয় মিশর, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, ওমান, সুদান, পাকিস্তান, লিবিয়া, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ায়। আর বাংলাদেশে কমবেশি সবত্রই খেজুর গাছ জন্মে। তবে বেশি দেখা যায় খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, বরিশাল, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, লালমাই পাহাড়ি এলাকা, ভাওয়ালের গড়, মধুপুরের গড়, ইত্যাদি এলাকায়। আমাদের দেশের খেজুর আকারে ছোট এবং তেমন সুস্বাদু নয় বিধায় গুড় ও রসের ব্যবহারই বেশি প্রাধান্য পেয়ে থাকে। রস আহরণের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা একটি বড় ফ্যাক্টর। কেননা আবহাওয়াজনিত কারণে মেঘলা বা বৃষ্টি হলে রস ঘোলা হয়ে থাকে এবং বলতে গেলে এর স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়।

খেজুর একটি অনন্য সাধারণ ফল। এটি কেবল মিষ্টি ও সুস্বাদু নয়, শক্তিবর্ধক ফল হিসেবে এতে প্রচুর পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা বিদ্যমান, যা বলে শেষ করা যাবে না। এটি রুচিবর্ধক, রক্তবর্ধক, স্নায়ুশক্তিবর্ধক, যৌনশক্তিবর্ধক ও বীর্যগাঢ়কারক, ইত্যাদি। এতে রয়েছে ১৮টি অ্যামাইনো অ্যাসিড, শর্করা, ভিটামিন ও মিনারেল। হূদেরাগ, বিষক্রিয়া, জ্বর, পেটের পীড়া, পাতলা পায়খানা, গলাব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাথাব্যথা, ঠান্ডা, কফ, নারীদের শ্বেতরোগ, রিকেট, ইত্যাদি ব্যারাম নিরাময়ে এই খেজুর ফল খুব কার্যকর। এদিকে এটি শারীরিক ও মানসিক শক্তি বাড়ায়। তাছাড়া হজমশক্তি বৃদ্ধিসহ রোগপ্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়।

একসময়ে হাজারি গুড় বলে বিশেষ স্বাদ ও সৌরভযুক্ত গুড় এই বাংলায় ছিল। আর এই হাজারি গুড় হারিয়ে যাওয়ার কারণে লোকসংগীত—ও হাজারি গুড় মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর। এই স্লোগানকে মানিকগঞ্জের জেলার ব্র্যান্ডিংয়ের স্বীকৃতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। আর হাজারি গুড়ের সুনাম পুনরুদ্ধারে খেজুরের বীজ বপনসহ সব রকম কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন প্রশাসনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। এটিকে সামনে রেখে প্রতি বছর ‘লোকসংগীত’ ও ‘হাজারি মেলা’ হয়ে থাকে। তত্কালীন সময়ে নাকি এই হাজারি গুড় দিল্লির বাদশাহ এবং যুগপত্ ইংল্যান্ডের মহারানিকে উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। এদিকে লোক মুখে জানা যায় যে, ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্যরা হাজারি গুড় ছাড়া অন্য গুড় দিয়ে ফিরনি, পায়েস বা ক্ষীর পাক করলে সেটি মুখেই দিতেন না। কেননা নবাবদের খাদ্য তালিকায় হাজারি গুড় খুব পছন্দের একটি উপাদান ছিল। এমনও দেখা গিয়েছে যে, শীতকালে নবাব পরিবারের গৃহিণীরা এই মৌসুমি হাজারি গুড়ের জন্য অপেক্ষা করতেন। কিন্তু হাজারি গুড়ের সেই ঐহিত্য আর নেই। এদিকে মাদারীপুরের কাঁচফোটের পাটালি গুড় একই ধারায় প্রসিদ্ধ। বর্তমানে যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় যে এমন একদিন আসবে, তখন কেবল বইয়ের পাতায় কিম্বা ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব স্বনামধন্য গুড়ের নাম জানা যাবে, বাস্তবে এর টিকিটিও দেখা যাবে না।

বাংলার ঐতিহ্য ও গর্বসহ এই কুটিরশিল্পকে আগের অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। খেতের আইলসহ পরিকল্পিতভাবে বাগান তৈরি করতে হবে। গাছিদের যথাযথ প্রশিক্ষণের কার্যক্রমসহ স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। তাছাড়া গাছের রোগ বালাই দূর করার জন্য কৃষি বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে চুয়াডাঙ্গায় কৃষি বিভাগের কার্যক্রম প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। এর মধ্যে একটি খুশির খবর হলো যে ময়মনসিংহের ভালুকা, যশোর ও মাগুরাসহ বেশ কিছু অঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সৌদি আরবের বীজ ও বৈশিষ্ট্যের আদলে খেজুরের চাষ হচ্ছে। যাহোক, এখন সেই প্রসদ্ধি হাজারি গুড়সহ প্রকৃত খেজুরের গুড় ও রস বর্তমান প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাস। কিন্তু আমরা যারা ছোটবেলায় যে প্রকৃত খেজুরের গুড় ও রস খেয়েছি। এখন তা ভেজালের কারণে সেই আস্বাদন না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস ও আফসোস করা ছাড়া গত্যন্তর দেখি না। অনেকে দুঃখ করে বলেন যে, প্রতি বছর শীত আসে, কিন্তু সেই প্রকৃত খেজুরের গুড়ের দেখা মেলে না।

n লেখক :গবেষক