গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে যখন গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ‘যাত্রাশিল্প’ অন্ধকার যুগের মধ্যে, তখনো অনেক এলাকায় ভালো ভালো যাত্রার কথা শুনেছি। দেখেছিও। এখন তো যাত্রা করার অনুমতি দেওয়াই হয় না স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এটি অঘোষিত নিয়ম। কারণ প্রকৃত শিল্পচর্চা আর নেই। শীত মৌসুম চলছে। আমন কাটার পর, বোরো মৌসুম শুরুর মাঝখানের সময়টাই যাত্রাগানের জন্য উপযুক্ত। এ সময় থাকে গ্রামের মানুষের দীর্ঘ অবসর। বিশেষ করে কৃষকদের। তাই অবসর বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ‘যাত্রা’ ছিল সবার কাছে বেশ পছন্দের। সবাই সন্ধ্যার পর প্রস্তুতি নিয়ে দলবেঁধে ছুটতেন যাত্রা দেখতে।
আকাশ সংস্কৃতির যুগে দর্শকদের রুচি যখন বদলেছে; তখনো যাত্রার কলা-কৌশলীরা নিরন্তর চেষ্টা করেছেন সংস্কৃতির মূল ধারায় নিজেদের ধরে রাখতে। কিন্তু শত চেষ্টাতেও তা হয়ে ওঠেনি। যাত্রায় খোলামেলা নাচ-গান যত সময় চলে—দর্শকদের ততক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হয়। কিন্তু গল্প আর ফুরায় না। এক পর্যায়ে দর্শকরাও মুখ ফিরিয়ে নেন। গল্প কোনোরকম মাঝপথে আসার পর দর্শকশূন্যতায় যাত্রাপালা শেষ করতে হয়।
আমি গ্রামের ছেলে হিসেবে একসময় যাত্রাপালার নিয়মিত দর্শক ছিলাম। নিজের চোখে দেখেছি কীভাবে দর্শকের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। কীভাবে পথে বসেছে যাত্রাশিল্পে নিয়োজিত মানুষগুলো।
নেত্রকোনা জেলার ডাকসাইটে যাত্রাশিল্পী ছিলেন আমার দাদু বিমল চক্রবর্তী। যিনি ছিলেন সরকারি প্রাথমিক স্কুলের একজন শিক্ষক। যাত্রায় অভিনয়ের সুবাদে যাঁকে মানুষ ‘ভাবনা কাজী’ হিসেবে চেনেন। এই নামে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত পৌষমেলায় প্রতিদিন যাত্রা থাকত। সেখানে নিয়মিত আমন্ত্রণ পেতেন তিনি। অন্যান্য চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করতেন তাঁদেরও খ্যাতির কমতি ছিল না। রাতভর কাঁথা গায়ে খড়ের মধ্যে বসে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সবাই পালা শুনতেন। অন্ধকার কাটিয়ে ভোর হয়ে সকাল। তখন যাত্রা শেষ হতো। কিন্তু শিল্পীর অভিনয় চোখ থেকে কোনোভাবেই সরত না। আমি বহুবার অভিনয় দেখে কাঁদতে দেখেছি দর্শকদের। একটি পালা শেষ হওয়ার পর অন্তত মাসখানেক তার রেশ থাকত। যাত্রা অনুষ্ঠানের পরদিন শিল্পীরা বাজারে এলেই সবাই তাঁদের ঘিরে ধরতেন। চা, পান খাওয়ানোর রীতিমতো প্রতিযোগিতা হতো। আর প্রতিটি চায়ের স্টলে উত্তাপ ছড়াত কার অভিনয় কত ভালো হয়েছে—সে গল্প।
সময় দ্রুত বদলায়। একসময় বাবা আমাদের দু’ভাইকে যাত্রাগানে যেতে দিতেন না। যতই বাধা দিন না কেন, বাবা চলে গেলেই বন্ধুদের সঙ্গে পালিয়ে চলে যেতাম যাত্রা দেখতে। এখন বুঝি। কেন বারণ করতেন। বাবা যাত্রা দেখতে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পর বের হতাম। আমরা ঢোকার সময় দেখতাম বাবা বাড়ি ফিরছেন। কারণ যাত্রা আর যাত্রা ছিল না। বাবার মতো অনেকেই যাত্রার পুরনো চেহারা দেখতে না পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মঞ্চের আশপাশে নারী দর্শক একেবারেই থাকত না। তেমনি বয়স্কদেরও আর দেখা যেত না।
এর ফাঁকে গ্রামে অনেক কিছু গিয়ে জায়গা দখল করেছে। যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজে নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এক শ্রেণির মানুষ তা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন। এটাও বড় ধরনের পবিবর্তন। সময় বলছে, ভালো কিছুর বিকল্প নেই।
আবহমান বাংলার এই লোক-ঐতিহ্য এখন শিল্পকলা একাডেমীর প্রশিক্ষণ হল ছাড়া কোথাও নেই! এটা মূল সংস্কৃতির জন্য অশনি সংকেত। যাত্রা, কবিগান, জারি, সারি, হাডুডু, মেলা, পুতুলনাচ, ধামাইল, পৌষপার্বণসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সবকিছুই কার্যত ইতিহাসের পাতায়। তবে আশার কথা, নাট্যশিল্পের পাশাপাশি দেশে যাত্রাশিল্পের সার্বিক কল্যাণ, প্রচার ও প্রসারের কথা ভাবছে সরকার। সম্প্রতি জাতীয় সংস্কৃতি নীতি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশোধন খসড়ায় যাত্রা, পুতুলনাচ ও নাট্যচর্চার পরিধি বাড়ানোসহ এর উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করা হয়েছে।
তাই বলতে চাই—যাত্রাশিল্পের সার্বিক কল্যাণ, প্রচার, প্রসার ও মানোন্নয়নের জন্য ঢাকায় একটি কেন্দ্রীয় যাত্রা একাডেমি ও পর্যায়ক্রমে জেলা ও উপজেলায় স্থাপন করা দরকার। প্রান্তিক পর্যায়ে নাটক ও যাত্রাশিল্পীদের ভাতা ও প্রয়োজনে অর্থ বরাদ্দ প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা
