মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে সমর্থকদের হামলার পর ঘরে-বাইরে চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হামলায় তার উসকানি রয়েছে কি না, সেটা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছেন মার্কিন কৌঁসুলিরা। ইতিমধ্যে তার মন্ত্রিসভার দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে মন্ত্রিসভার সদস্যরা আলোচনা করছেন। ডেমোক্র্যাট নেতারা জানিয়েছেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এ ব্যাপারে উদ্যোগ না নিলে আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসে ট্রাম্পকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হামলাকারীদের নিন্দা করে সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে হামলার ঘটনায় আহত পুলিশ কর্মকর্তা মারা গেছেন। আর হামলায় জড়িতরা চাকরি হারাচ্ছেন বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিজেকে ক্ষমা করতে চান ট্রাম্প
নিজেকে ক্ষমা করা যায় কি না এবং করলে আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে আলোচনা করছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি হোয়াইট হাউজের পরামর্শক প্যাট সিপোলনসহ সহযোগী ও আইনজীবীদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন। সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কংগ্রেস ভবনে ট্রাম্পের সমর্থকদের হামলা কিংবা জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেটকে ভোটের ফল পালটে দিতে চাপ দেওয়ার কথা ফাঁস হওয়ার পর তিনি দায়মুক্তির আলোচনায় জোর দিয়েছেন কি না, সেটি স্পষ্ট নয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, এ রকম ঘটনা ঘটলে তা হবে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানায়, গত ৩ নভেম্বরের পর থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিজেকে ক্ষমা করার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন। এর আগে ২০১৮ সালে এক টুইটার বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘বহু আইনবিদের সঙ্গে কথা বলে আমি জেনেছি, নিজেকে ক্ষমা করার পূর্ণ ক্ষমতা আমার আছে। কিন্তু কেন সেটা আমি করতে যাব, আমি তো কোথাও কোনো ভুল করিনি?’
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন কি না, সেই বিষয়ে নির্দিষ্ট করে উত্তর দেওয়াটা কঠিন। কারণ এর আগে কোনো প্রেসিডেন্ট এ কাজ করেননি। তবে ফেডারেল ক্ষমার অর্থ এই নয় যে, রাজ্যে বিভিন্ন ফৌজদারি মামলা থেকে তিনি রেহাই পাবেন। কারণ তার ব্যবসায়িক বিষয় নিয়ে মামলা বিভিন্ন রাজ্যের আদালতে চলমান। এর আগে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিজেদের ক্ষমতাবলে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সিএনএন জানায়, বিচার বিভাগের একটি লিগ্যাল মেমোতে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন না। তবে তিনি পদত্যাগ করে ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে পারেন এবং তার কাছে ক্ষমার আবেদন করতে পারেন। তবে সেই লিগ্যাল মেমোটিও চূড়ান্ত কিছু নয়। সিএনএনের আইন বিশ্লেষক এলি হানিগ গত বছর বলেছিলেন, নিজেকে ক্ষমা করার প্রক্রিয়ায় অনেক আইনি চ্যালেঞ্জ আছে।
দ্বিতীয়বার অভিশংসনের মুখে ট্রাম্প
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শ্যুমার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসনের দাবি করেছেন। তারা বলেছেন, সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীকে কাজে লাগিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং মন্ত্রিপরিষদের উচিত ট্রাম্পকে অভিশংসনের কাজ শুরু করা। তারা সেই কাজ না করলে আগামী সপ্তাহে প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে ডেমোক্র্যাটরা জানিয়েছেন। যদিও ভাইস প্রেসিডেন্টের এক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, মাইক পেন্স এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। বাইডেনও বলেছেন, শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুতে তার ইচ্ছা নেই। বরং তিনি দায়িত্ব গ্রহণের ওপরই বিশেষ নজর দিচ্ছেন। তার এক ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বাইডেনের মতে এই অভিশংসন দেশকে একত্রিত করতে সহায়তা করবে না। তবে বাইডেন বলেছেন, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসীদের হামলার জন্য উসকানি দিয়েছেন।
অভিশংসন কি সম্ভব?
আগামী ২০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বাইডেন শপথ গ্রহণ করবেন। ফলে মাত্র এই কয়েক দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসন করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। পেলোসি অভিশংসনের দাবি করলেও সিদ্ধান্ত জানাননি। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে ট্রাম্পকে অভিশংসন করা হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ অনেক সিনেটরই ট্রাম্পের পক্ষে। আবার বর্তমান সিনেটের পরবর্তী অধিবেশন বসার কথা ১৯ জানুয়ারি। এর আগে ২০১৯ সালে ট্রাম্পকে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত করা হলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটা সিনেটে নাকচ হয়ে যায়। এর আগে মাত্র দুই মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিশংসিত হয়েছেন। তবে কোনো প্রেসিডেন্টই দুই বার অভিশংসিত হননি।
ভিডিও বার্তায় যা বলেছেন ট্রাম্প
১২ ঘণ্টা পর টুইটার অ্যাকাউন্ট ফিরে পাওয়ার পর নতুন ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প দাঙ্গাকারীদের হামলাকে ‘বর্বরোচিত’ উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্যের মাধ্যমে গত বছরের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের পরাজয় এই প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, কংগ্রেস ভোটের ফল অনুমোদন করেছে। ২০ জানুয়ারি একটা নতুন প্রশাসনের উদ্বোধন হবে। এখন আমার লক্ষ্য হবে সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্নভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এই মুহূর্তে দরকার হলো নিরাময় ও মিটমাট করে ফেলা। এদিকে তিনি তার দুর্দান্ত সমর্থকদের প্রশংসা করে বলেছেন, আমাদের অসাধারণ যাত্রা শুরু হলো।
পদত্যাগের হিড়িক
হামলার পর গতকাল পর্যন্ত মার্কিন পরিবহন মন্ত্রী এলাইন চাও এবং শিক্ষামন্ত্রী বেটসি ডেভোস পদত্যাগ করেছেন। এছাড়া হোয়াইট হাউজের আরো চার জন নিরাপত্তা উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন। প্যাট সিপোলন পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। এদিকে সহিংসতার সময় আহত পুলিশ কর্মকর্তা ব্রিয়ান সিকনিক মারা গেছেন। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে পাঁচ জনে দাঁড়িয়েছে। হামলার ঘটনায় জড়িতদের ব্যাপারে তদন্ত শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫টি মামলা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল মাইকেল শেরউইন জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের উসকানির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ পেলেই মামলা করা হবে। হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শিগিগরই পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন ক্যাপিটল পুলিশ প্রধান স্টিভেন সান্ড।
বাইডেনের শপথে যাবেন না ট্রাম্প
ট্রাম্প গতকাল এক টুইটার বার্তায় জানিয়েছেন, যারা জানতে চেয়েছে তাদের বলছি, আমি ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে যাচ্ছি না। গত ১৫০ বছর পর এই প্রথম কোনো বিদায়ি প্রেসিডেন্ট তার উত্তরসূরীর শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না। ট্রাম্প হবেন উত্তরসূরীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে না যাওয়া চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সর্বশেষ এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৮৬৯ সালে। ঐবার বিদায়ি প্রেসিডেন্ট এন্ড্রু জনসন পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস গ্র্যান্টের সঙ্গে একই ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে শপথ অনুষ্ঠানে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। অবশ্য ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এখন পর্যন্ত এরকম কিছু করার ইঙ্গিত দেননি। রাজধানী ওয়াশিংটনে অবস্থিত কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলের সিঁড়িতেই নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বুধবার এই ভবনেই হামলা চালায় ট্রাম্প সমর্থকরা।
শীর্ষ জেনারেলের সঙ্গে আলাপ ন্যান্সি পেলোসির
স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি কংগ্রেসম্যানদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জানিয়েছেন, তিনি শুক্রবার সকালে জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল মার্ক মিলির সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং পরমাণু কোড নিয়ে আলোচনা করেছেন। কথা বলার কারণ সম্পর্কে পেলোসি লিখেছেন, মানসিকভাবে অস্থির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাতে শত্রুতা করে হামলা বা পরমাণু হামলা চালানোর নির্দেশ না দিতে পারেন। কারণ বর্তমান প্রেসিডেন্টের চেয়ে বিপজ্জনক আর কেউ নেই। তাই আমেরিকার জনগণ এবং গণতন্ত্রকে রক্ষায় আমাদের সবকিছু করতে হবে। পেলোসি লিখেছেন, প্রায় ৫০ বছর আগে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বলেছিলেন, ‘আপনার যাওয়ার সময় হয়েছে’। এখন বিপজ্জনক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যাপারেও তাদের একই কথা বলা উচিত।
চীনের প্রতিক্রিয়া
চীন ক্যাপিটল হিলে হামলার প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, অভ্যন্তরীণ পতনের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনা সরকার পরিচালিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস বলেছে, মার্কিন সমাজে যে বড় বিভক্তি হয়েছে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলেছে এই হামলা তারই প্রতিফলন।—বিবিসি, রয়টার্স ও সিএনএন
