পাট শাক পরিষ্কার করে তার মধ্যে সজনে পাতা, কচু পাতা একটু খানি দেওয়া হয়। তারপর আদা, রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ, পরিমাণমতো লবন ও খাবার সোডা দিয়ে উনুনে বসিয়ে দেওয়া হয়। ঘন হয়ে এলে নাড়তে হয়, এভাবে তৈরি হয় পাট ও কচুর পাতার প্যালকা। মৌসুমে নাপা শাক বাছাই করে তার সাথে সামান্য পরিমাণ বথুয়া শাক দিয়ে উনুনে বসিয়ে দেওয়া হয়।
পাটশাক ও কচু পাতার প্যালকার ন্যায় মসলা ব্যবহার করে তৈরি হয় নাপা শাকের প্যালকা। এসব প্যালকা দেখতে অনেকটা চাইনিজ স্যুপের মতো। প্রবাদ আছে, ‘প্যালকা দুশমনে পষে’, অর্থাত্ প্যালকা দুশমনে পরিবেশন করে
মো. আমিরুজ্জামান
উত্তরের মানুষের প্রিয় খাবার প্যালকা ও সিঁদুল। এলাকা ভেদে এক এলাকায় একেক ধরনের খাবার জনপ্রিয় হলেও উত্তরের রংপুর বিভাগের ৮টি জেলায় অসম্ভব জনপ্রিয় প্যালকা ও সিঁদুল। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি অতিথি এলেও আপ্যায়নে এই দুই পদের খাবার খাওয়াতেও ভুল করেন না। খাদ্য তালিকায় এই দুটি খাবারের স্বাদ নিয়ে তৃপ্ত হন বাড়িতে আসা অতিথিরা।
প্যালকা তৈরির মূল উপকরণ হলো পাট শাক, নাপা শাক, কচুর পাতা। পৃথক পৃথকভাবে এগুলো দিয়ে প্যালকা রান্না করে পরিবেশন করা হয়। নাপা শাক উত্তরের কয়েকটি জেলার মানুষ চাষ করেন না, তাই এটির প্যালকা তারা করেন না। তবে কচুর পাতা ও পাট শাকের প্যালকা প্রায় সব জায়গার মানুষ পছন্দ করেন।
পাট শাক পরিষ্কার করে তার মধ্যে সজনে পাতা, কচু পাতা একটু খানি দেওয়া হয়। তারপর আদা, রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ, পরিমাণমতো লবন ও খাবার সোডা দিয়ে উনুনে বসিয়ে দেওয়া হয়। ঘন হয়ে এলে নাড়তে হয়, এভাবে তৈরি হয় পাট ও কচুর পাতার প্যালকা। মৌসুমে নাপা শাক বাছাই করে তার সাথে সামান্য পরিমাণ বথুয়া শাক দিয়ে উনুনে বসিয়ে দেওয়া হয়।
পাটশাক ও কচু পাতার প্যালকার ন্যায় মসলা ব্যবহার করে তৈরি হয় নাপা শাকের প্যালকা। এসব প্যালকা দেখতে অনেকটা চাইনিজ স্যুপের মতো। প্রবাদ আছে, ‘প্যালকা দুশমনে পষে’, অর্থাত্ প্যালকা দুশমনে পরিবেশন করে। পিচ্ছিল হওয়ার কারণে হাতা ও চামচে পরিমাণমতো উঠতে চায় এই সুস্বাদু প্যালকা। কচুর পাতার প্যালকা পরিবেশনের সময় লেবু দিতে হয়, যাতে মুখে না লাগে। এই প্যালকা, সিঁদুল, বথুয়া ও নাপা শাক নিয়ে অনেক ভাওয়াইয়া গান রচিত হয়েছে উত্তরের জনপদে।
অপরদিকে, সিঁদুল তৈরিটা বেশ কষ্টকর। তবে ভর্তা ও রান্না করে খেতে দারুণ সুস্বাদু। প্রথমে পুঁটি, চোপড়া জাতীয় মাছ শুটকি করতে হয়। ভালোভাবে শুকানোর পর শুটকি গুড়ো করে পাউডার করা হয় উরুন গাইনে। তার সাথে কালো কচুর শুকনো কুচি কুচি মেশানো হয়। এভাবে তৈরি করা হয় পেস্ট। তারপর হাতের তালুতে হলুদ ও সরিষার তেলে সাইজ মতো গোলাকার করে গোল বানানো হয়। তবে এটি বানানোর সময় যেন মাছি না বসে, তাহলে পোকা ধরার সম্ভাবনা থাকে।
সিঁদুল সংরক্ষণ পদ্ধতি এক এক স্থানে এক একেকরকম। কেউ রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন। কেউ কেউ পাতলা সুতি কাপড়ে মুড়িয়ে মাটির হাঁড়িতে ছাই দিয়ে সংরক্ষণ করেন। অনেকে উনুনের একটু ওপরে ঝুলে রাখেন। যেভাবে রাখুক না কেন সিঁদুলে যাতে পোকার আক্রমণ না হয় সেদিকে নজর রাখতে হয়।
সিঁদুল ভর্তা ও রান্না করে খাওয়া যায়। ভর্তা করার জন্য সিঁদুল হালকা ধুয়ে নিতে হয়। তারপর কচুর পাতে মুড়িয়ে চুলার আগুনে পুড়িয়ে নিতে হয়। এরপর কচুর সরিয়ে নিয়ে মাটির পাত্র নোড়ায় ভর্তা করা হয়। এ সময় ধনে পাতা, কাঁচা মরিচ, রসুন, আদা বাটা দিয়ে পরিবেশনের জন্য তৈরি হয় সিঁদুলের ভর্তা। সরিষার তেল মেশালে আরো মজাদার হয় ভর্তা।
রান্নার জন্য সিঁদুলে বোয়াল, শোল, মাগুর, রিটা, টাকি ইত্যাদি যেকোনো একটি মাছ দিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়। উত্তরের মানুষ ও বাড়িতে কোনো অতিথি এলে এই দুটি খাবার পরিবেশনে ভুল করেন না। বয়স্ক নারীরা একাজে খুব পারদর্শী হলেও বর্তমানে শহর ও গ্রামের কোনো নারীরা এই ঝামেলার কাজে যেতে চান না। ফলে উত্তরের মানুষের ঐতিহ্যবাহী প্যালকা ও সিঁদুলের ভর্তা এবং রান্নার স্বাদ নেওয়াটা ভুলতে বসেছেন।
