আহসান জোবায়ের
ব্যস্ত নগরীর খোলা আকাশের দিকে তাকানোর সময়ই থাকে না। রাজধানীর বড় বড় অট্টালিকার ভিড়ে আকাশে নজর একটু কমই পড়ে। ঘুড়ি ওড়ানোর মাধ্যমে পৌষ মাসকে বিদায়ের উপলক্ষে নীল আকাশের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পুরান ঢাকাবাসীর আয়োজন সাকরাইন উত্সব, যা ঘুড়ি উত্সব নামেও পরিচিত। পুরান ঢাকায় হরেকরকম রঙিন ঘুড়ি আর নানা ডিজাইনের ছোট-বড় আকৃতির ঘুড়ি পুরান ঢাকার আকাশকে রঙিন করে তোলে।
কোনো ঘুড়ি মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, আবার কোনো ঘুড়ি আকাশে রাজত্ব করছে। কোনো ঘুড়ি দিগন্ত ছাড়িয়ে যায় অন্য দিগন্তে, আবার কোনো ঘুড়ি নাটাই ছেড়ে উড়ে যায় আকাশের নীল সীমানায়। বাহারি নামের লেঞ্জা ঘুড়ি, চাপালিশ, পঙ্খিরাজ, একরঙ্গা ঘুড়ি ৮ থেকে ৫০ টাকা করে বিক্রি করা হয়। তবে সুতোর দাম ছোট বান্ডিল হলে ৮০ টাকা আর বড় বান্ডিল হলে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। ঘুড়ি উত্সবে ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত হয় প্রতিটি বাড়ির ছাদ, চলে ঘুড়ির মুক্তবাক। বাংলা গানের তালে তালে চলতে থাকে ডিজে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উত্সবমুখরতা। বাড়ে আকাশে ঘুড়ির সংখ্যাও। ঘুড়ির এই খেলা সকাল থেকে সন্ধ্যা অবদি চলে। দিনের আলো শেষে যেমন অন্ধকার নামে তেমনি ঘুড়ি নাটাইয়ের কাছে এসে পৌঁছে সন্ধ্যার লাল আলোতে। শুরু হয় রাতের কসরত। সন্ধ্যার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো, আগুন নিয়ে খেলা, বড় বড় গ্যাস বেলুন ওড়ানো, হরেকরকমের লাইটিং, যা অন্ধকার আকাশকে বিভিন্ন আলোয় আলোকিত করে। আর ডিজের তালে তালে চলতে থাকে গান, নাচ। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, মিলব্যারাক, সদরঘাট, নবাবপুর, লালবাগ, চকবাজার, দয়াগঞ্জ , মুরগিটোলা, ধুপখোলা মাঠ, বংশাল, ওয়ারী, ইসলামপুর, শাঁখারিবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, তাঁতীবাজার ও রায় শাহেব বাজার এলাকার মানুষ ঘটা করে সাকরাইন উত্সব পালন করে।
সাকরাইন যেভাবে এলো
পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বলে যে উত্সব দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয় তারই ঢাকাইয়া নাম সাকরাইন। ভারতে পৌষ সংক্রান্তি নামে, নেপালে এটা পরিচিত মাথী নামে, থাইল্যান্ডে সংক্রান, লাওসে পি মা লাও, মায়ানমারে থিং ইয়ান কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে পরিচিত। প্রাচীনকাল থেকেই এ উত্সব চলে আসছে। তবে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। হতে পারে এটা হাজার বছরের উত্সব বা তারও আগের। ১৭৪০ সালের দিকে মুঘল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের সময় ঘুড়ি ওড়ানো এই দিনটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সাকরাইন একটি অন্যতম উত্সবে পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ না রেখে সকলে এ উত্সব পালন করে থাকেন।
বাংলা পৌষ মাসের শেষদিন ও মাঘ মাসের প্রথমদিন উদযাপন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি। বর্তমানে ‘পৌষ সংক্রান্তি’ শুধু ‘সংক্রান্তি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে, আর পুরান ঢাকার মানুষ একে বলে ‘সাকরাইন’। সাকরাইন শব্দটি সংস্কৃত শব্দ সংক্রন থেকে এসেছে। সংক্রনের আভিধানিক অর্থ বিশেষ মুহূর্ত। অর্থাত্ বিশেষ মুহূর্তকে সামনে রেখে যে উত্সব পালিত হয় তাকেই বলা হচ্ছে সাকরাইন উত্সব। উত্সবটি শুরু হয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকেই। তখন উত্সবটি সনাতন ধর্মের মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল আর এখন সব ধর্ম-বর্ণ-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ এ উত্সব পালন করেন। পুরান ঢাকার তরুণরা সারাবছর এই ঘুড়ি উত্সবের অপেক্ষায় থাকে। এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত না খেয়ে থাকেন। আর ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা দিনটিতে সকালে পিঠা, বাখরখানি মোয়াসহ নানা ধরনের খাবার বিলি করেন প্রতিবেশীদের মাঝে। সাকরাইন উত্সবকে পৌষ সংক্রান্ত্রি বা ঘুড়ি উত্সবও বলা হয়।
এবারের সাকরাইন
এবারের সাকরাইন উত্সবটি কর্ম দিবস হওয়া সত্ত্বেও উত্সবপ্রিয় মানুষের মনে এতটুকু বাঁধসাধতে পারেনি ক্লান্তি। উত্সবের আমেজ ছিল পুরো এলাকায়। তবে সবটাই দালানের ছাদে। সাউন্ড বক্সের কল্যাণে দূরন্ত মিউজিক, রকমারি আলোকসজ্জায় ঝলমল করে চারপাশ। রাত যত বাড়তে থাকে ততোই যেন বাড়ে রঙ। শীত বুড়িকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রাণের উত্সব সাকরাইন প্রাণ সঞ্চার করে মানুষের মাঝে। সারাদিন আকাশে নানারঙের হাজার হাজার ঘুড়ি উড়িয়েছেন পুরান ঢাকাবাসী। পঙ্খিরাজ, চোখদার, বোয়াদার, গায়েল, নাখপান্দার, নোমাইলদার, বলদার, পেটকাদার, মাছরাঙা, টেক্কা, গরু শিং, রগগুড্ডি, প্লাস্টিক ঘুড়িসহ নানা নামের ঘুড়ি। ছোটরা থেকে বৃদ্ধ সকলেই এদিন শখের বসে ঘুড়ি উড়িয়েছেন। দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়িয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তিবোধ করেন তারা। সাকরাইনকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার আশেপাশের অলিগলিতে বিভিন্ন ঘুড়ির দোকান ও মেলা বসে। স্থানীয়রা জানান, পৌষের শেষে জামাইরা শ্বশুরবাড়ি এলে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো ঘুড়ি ও নাটাই। সব বাড়ির জামাই ঘুড়ি ওড়ালে ঘটা করে সেসব দেখতেন সবাই। তবে এমনটা এখন আর হয় না। কিন্তু উত্সবটা এখনো রয়ে গেছে। তাই ঘুড়ি ওড়ানো পৌষ বিদায়ী উত্সবের অংশ হয়ে আছে। পুরান ঢাকার অনেক স্থানীয় বাসিন্দা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বসবাস করলেও তারা এই দিনকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার সাকরাইন উত্সবে অংশ নেন। মেয়েরা তাদের শ্বশুরবাড়ি থেকে এই দিনটি উদযাপন করতে বাপের বাড়ি চলে আসেন। ফলে সবার মাঝে এক ধরনের উত্সবের আমেজ বিরাজ করে।
ছবি :তন্ময় মির্জা ও পত্র পল্লব
