মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
বীর নূর মোহাম্মদের জন্ম ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬, যশোর জেলার নড়াইল থানার মহেশখালি গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ কৃষক, মাতা জেবুন্নেসা খানম গৃহিণী। জমিজমা চাষবাস করে সংসার ভালোভাবেই চলত। একটু বড় হলে নূর মোহাম্মদ শেখকে বাড়ৈপাড়া পাঠশালায় ভর্তি করে দেয়া হলো। কিন্তু লেখাপড়ায় সেই ছেলের মোটেও মন নেই। দস্যিপনাতেই তাঁর ঝোঁক। হেসে খেলে জীবন অতিবাহিত করাতেই তাঁর আনন্দ। একমাত্র সন্তান এবং আগের পুত্রের অকাল মৃত্যুতে মাতাপিতা একটু অতিরিক্ত আদর দিয়েই নূর মোহাম্মদ শেখকে বড় করতে লাগলেন। কিন্তু সেই আদর আর বেশিদিন ঠিকল না। প্রথমে তার মা জেবুন্নেসা মারা গেলেন, এর তিন বছর পর বাবা। সংসারে তাঁকে দেখাশুনার আর কেউ রইল না। মা মারা যাবার সময় তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর।
চাচা-চাচি তাঁকে দেখাশুনার জন্য নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও অল্পকিছু দিনের ব্যবধানে চাচা-চাচি দুজনেই মৃত্যুবরণ করলেন। এখন দেখাশোনার আর কেউ নেই। সমবয়স্ক বন্ধু বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশিরা হয়ে উঠল তাঁর জীবনের একমাত্র সাথী। ছোটবেলা থেকেই নূর মোহাম্মদ সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। খেলাধুলায় অংশ নিয়ে কৃতিত্ব দেখাতেন। গান বাজনায়ও তাঁর ঝোঁক ছিল। দারুণ গলায় গাইতে পারতেন। তিনি পরোপকারিও ছিলেন। মানুষের শোকে-দুঃখে ডাকলেই চলে যেতেন, ফলে গ্রামের মধ্যে একজন প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠলেন নূর মোহাম্মদ শেখ।
কিন্তু সংসার চলে কী করে, খাওয়া পরা, চলার মতো টাকা পয়সা আসবে কীভাবে! নিজে তো হালচাষ করতে জানেন না, অন্য কোনও কাজও তিনি জানে না। ফলে সহজ যে কাজ, জায়গা জমি বিক্রি করতে লাগলেন। হাতে কিছু টাকা পয়সা এসে গেল। গ্রামের বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে একটা যাত্রা গানের দল করে ফেললেন। নিজের শখ মেটাতে একটা কলের গানও কিনে ফেললেন। এই লাগামছাড়া এবং দায়িত্বহীন চলাফেরা থেকে সংসারের দিকে ফেরাতে তাঁর মামা-মামি নিধিখোলা গ্রামের ১২ বছরের এক কিশোরী, তোতা বিবির সাথে তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। তখন ১৯৫২ সাল। বিয়ের পর তিনি শ্বশুর বাড়িতেই থাকতেন। তাঁদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। নাম রাখেন হাসিনা বানু। কন্যার জন্মের পর নূর মোহাম্মদ একটু ভাবনায় পড়েন। কী করার কথা, আর তিনি কী করছেন। এভাবে তো চলবে না। অন্তত কন্যা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য হলেও তাঁকে তো কিছু করতে হবে। কী করবেন। নিজে একটা কাজ খোঁজার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত একটা কাজ পেলেন আনসার বাহিনিতে। কিন্তু বেতন যা দেয়, তাতে সংসার তো চলে না। অভাব অনটন লেগেই থাকে। অতিষ্ঠ হয়ে একদিন আনসার বাহিনির চাকরি ছেড়ে চলে এলেন ঢাকায়, রাজধানীতে। ১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি ইপিআরএ যোগদান করেন।
প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে পাঠানো হয় রাজশাহীতে, ইপিআর ব্যারাকে। দীর্ঘ কয়েক মাসের কঠিন প্রশিক্ষণ শেষে পোস্টিং হয় দিনাজপুরের কুঠিবাড়িতে। বেতন আটচল্লিশ টাকা। লেখাপড়া কম জানলেও নূর মোহাম্মদ আসলে মেধাবি ছিলেন। এর ফলে তাঁর দ্রুত উন্নতি হয়। ১৯৬৩ সালে তাঁর বেতন বেড়ে দাঁড়ায় সাতানব্বই টাকা।
১৫ নভেম্বর ১৯৬৪ তাঁর এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দেয়। উভয় পক্ষ যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে এগুতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত একটা যুদ্ধও সংঘটিত হয়। দিনাজপুর সীমান্তে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হয়। নূর মোহাম্মদ তখন দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়ান। দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ভারতীয় সেনাদের গোলার আঘাতে আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবশ্য অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। তাঁর দায়িত্ব, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতার পরিচয় পেয়ে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ‘তমঘায়ে জঙ’ ও ‘সিতারায়ে হারম’ নামে দুটি খেতাবে ভূষিত করে এবং তাঁর বেতন দশ টাকা বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭০ সালের ১ জুলাই পর্যন্ত তিনি দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। এরপর তাঁকে যশোর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে বদলি করা হয়। যশোরে ইপিআর এর ৪ নং উইংএ যোগ দিলেন তিনি। যশোর সেনানিবাসে সংখ্যার দিক দিয়ে বাঙালির চেয়ে অবাঙালি সৈনিক কম ছিল। তবে অফিসাররা সবাই ছিল পাকিস্তানি এবং তারা স্বভাবতই বাঙালি সৈনিকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। ইচ্ছে হলেই তাদের হয়রানি করত এবং নানাভাবে শাস্তি প্রদান করত।
পরের অংশ আগামীকাল
