১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হওয়ার পর ২৫ দিনের মাথায়, ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি সদ্যস্বাধীন দেশে ফিরে আসেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দিনটিকে বাঙালি জাতি স্মরণ করে ‘বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’ হিসেবে। বাংলা ভাষায় ‘প্রত্যাবর্তন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘পুনরাগমন’ বা ‘ফিরে আসা’। আর ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ মানে হলো ‘নিজের দেশে ফিরে আসা’। নির্বাসন, বিপ্লব প্রভৃতি কারণে বিশ্বের অনেক দেশের অনেক নেতার নানাভাবে বিদেশ থেকে স্বদেশে ফেরার কাহিনি রয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন অন্যান্য সব ইতিহাসকে ম্লান করে দিয়েছে।
আজ থেকে ৪৯ বছর আগে ১০ জানুয়ারি, এই দিনে বীর বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় পূর্ণতা পায়। ১০ জানুয়ারি তিনি ঢাকায় পৌঁছানোর পর আনন্দে উদ্বেল লাখ লাখ মানুষ বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত তাকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানায়। সেদিন বিকেল পাঁচটায় তিনি রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দেন। ১৭ মিনিটের এই ভাষণে সংশ্লিষ্ট সকলকে শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত ছিলাম, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান একবার মরে দুইবার মরে না।’
বাঙালির নয়নমণি শেখ মুজিবের ফিরে আসাকে উপলক্ষ্য করে ৭২-এর ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল একটি জনসাগরে। বরেণ্য সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী এ দিনটির বর্ণনা দিতে গিয়ে তার একটি লেখায় লিখেছিলেন, সেদিন বিমান থেকে বিহঙ্গদৃষ্টিতে ঢাকার রাজপথে মানুষের ঢল দেখে তার দু চোখ ভরে শুধু আবেগজড়িত কান্নার পানিতে চোখ ভিজে ছিল। পাকিস্তান থেকে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ঢাকায় ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু। লন্ডন থেকে ঢাকা পর্যন্ত দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টার যাত্রাপথের পুরোটাই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গী হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জী। তিনি পরে স্মৃতিচারণ করেছেন:‘পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে এলেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে তাকে দিল্লি হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছে দিতে সহযাত্রী হই আমি।’ ৯ জানুয়ারি ১৯৭২, ভোর ৬টা। লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌঁছালেন বঙ্গবন্ধু। তাকে স্বাগত জানালেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ বিভাগের কর্মকর্তা ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার আপা বি. পন্্থ।
‘১০ জানুয়ারি ১৯৭২। দুপুরে বিমান থেকে ঢাকায় নামলেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনস্রোত আর মানুষের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ। সোচ্চার ধ্বনি উঠছে, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘জয় মুক্তিযুদ্ধ’। সে এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত, চারদিকে মুক্তি আর মহানেতাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। আজও চোখে লেগে আছে মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটি।’ শশাঙ্ক ব্যানার্জীর বর্ণনায় ৭২-এর সেই দিনটি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তরুণ কর্মকর্তা ছিলেন দেব মুখার্জী, যিনি পরবর্তীকালে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশে ফেরার দিনের ঘটনার স্মৃতিচারণ করে মুখার্জী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এর আগে কয়েক সপ্তাহ শেখ মুজিবকে নিয়ে অনেকে বেশ উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ পাকিস্তানের কারাগারে তিনি বেঁচে আছেন কি না— সেটি নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল অনেকের মনে। দেব মুখার্জী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তার জন্য ভারতকে অভিনন্দন জানিয়ে শেখ মুজিব উষ্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিব একই মঞ্চে বক্তৃতা করেন সেদিন।
মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে ছিলেন, কিন্তু তার ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে ভাষণের প্রবল শক্তিশালী শব্দমালা বাঙালি জাতির অন্তরে, মননে, অস্তিত্বে একাকার হয়ে ছিল এবং তা বর্তমানেও আছে। বঙ্গবন্ধুর আদেশে বীর বাঙালি সাহসের জোরে দেশকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে। কিন্তু তিনি যদি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত না হতেন, তাহলে এখন যে রকমভাবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তার অনেক আগেই বাংলাদেশ মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর হয়ে যেতে পারত। তখন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকার কারণে বেঁচে যান। পরের সরকারগুলো শেখ হাসিনাকে দেশে আসতে না দেওয়ার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর মতো এক প্রকার চ্যালেঞ্জ নিয়েই ১৯৮১ সালের ১৭ মে তাকেও স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করতে হয়। তখনো রাজধানী ঢাকার অবস্থা সে রকমই হয়েছিল। তার পরে শেখ হাসিনা ২০০৭ সালের সামরিক পরিবেষ্টিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রোষানলে পড়ে আবারও চ্যালেঞ্জ নিয়েই বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।
এ দিনটি তাই বাঙালি জাতির জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে পরিচিত। যে কোনো পরিস্থিতিতে স্বদেশের সঙ্গে লগ্ন থাকার অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হিসেবে দিনটি বাঙালি জাতির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একসাগর মৃত্যুর বিভীষিকাময় রাতের পর নতুন আলো ও আশা-ভরসা নিয়ে যেমন ফিরে আসে নতুন দিনের সূর্য, সেভাবেই ৭২-এর ১০ জানুয়ারি আমাদের মধ্যে ফিরে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ বাঙালির ইতিহাসে দিনটি চিরকাল লেখা থাকবে অমোচনীয় অক্ষরে।
n লেখক :ইংরেজির অধ্যাপক এবং উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
