বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক,
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর
হাসেম সাহেব দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করেন। বহুবছর পর্যন্ত তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয়নি। এবার ভাতিজার বিয়েতে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখেন প্রতিটি ঘরে টেলিভিশন। সহজে দেশ-বিদেশের খবর সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। বিদ্যালয়ে তথ্য প্রযুক্তি সাহায্যে শিক্ষাদান চলছে। বর্তমানে তার গ্রামের মেয়েরা শহরে গিয়ে চাকরি করছে।
ক) সমাজ কী ? খ) শিক্ষা হলো এক ধরনের সংস্কার সাধন ও বিরামহীন প্রক্রিয়া— বক্তব্যটি বুঝিয়ে লেখ। গ) হাসেম সাহেবের গ্রামে সামাজিক পরিবর্তনে যে উপাদানটির কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়। তা ব্যাখ্যা কর। ঘ) ‘তুমি কী মনে কর উক্ত উপাদানটি সামাজিক পরিবর্তনের একমাত্র কারণ?’- উক্তিটি মূল্যায়ন কর।
ক) উত্তর ঃ সমাজ হচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের জটাজাল , যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
খ) উত্তর : শিক্ষাকে আলোকবর্তিকার সাথে তুলনা করা যায়। শিক্ষার আলোয় মানুষ আলোকিত হয় এবং এর মাধ্যমে যাবতীয় অজ্ঞানতা, অন্ধকার ও কুসংস্কার দূর হয়। এটি মানবসমাজের সংস্কার সাধনের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী মাধ্যম এবং সবসময় তা চলতে থাকে। তাই শিক্ষাকে বিরামহীন প্রক্রিয়া বলা হয়।
গ) উত্তর ঃ হাশেম সাহেবের গ্রামে সামাজিক পরিবর্তনে তিনটি উপাদানের কার্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়। যথা-১। যোগাযোগ, ২। প্রযুক্তি ৩। শিল্পায়ন ও নগরায়ণ। হাসেম সাহেব তার গ্রামের বাড়ি গিয়ে দেখেন প্রতিটি ঘরে টেলিভিশন। সহজে দেশ-বিদেশের খবর সেখানে পাওয়া যাচ্ছে। তার গ্রামে এ পরিবর্তনে যোগাযোগ নামক উপাদানের কার্যকারিতা রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সামাজিক পরিবর্তনের একটি অন্যতম উপাদান। জল ,স্থল ও আকাশপথে যোগাযোগ, টেলিফোন , ফ্যাক্স , ইন্টারনেট , ই-মেইল , ডিস এন্টিনা , মোবাইল ফোন , রেডিও , টেলিভিশন , বিভিন্ন ধরনের পত্র-পত্রিকা প্রভৃতি সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। আজকাল ঘরে বসে বিশ্বের সকল দেশের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পাঠাগার ঘরে বসে ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় পাঠ নির্বাচন করে পড়াশুনা করা যায়। তাছাড়া
প্রযুক্তির প্রচলন ও প্রসারের মাধ্যমে সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয়। হাসেম সাহেবের গ্রামের বিদ্যালয়ে আইসিটির (তথ্য প্রযুক্তির ) মাধ্যমে শিক্ষাদান চলছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে প্রযুক্তির প্রসারের ফলেই। অন্যদিকে ,হাসেম সাহেবের গ্রামের মেয়েরা শহরে গিয়ে চাকরি করছে। এক্ষেত্রে শিল্পায়ন ও নগরায়নের কার্যকারিতা রয়েছে। শিল্পায়নের ফলে শিল্পের প্রসার ঘটে , কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং নগরায়ন ঘটে। ব্যাপক শিল্পায়নের ফলে গ্রামীণ জীবন ছেড়ে নগর জীবন পদ্ধতি গ্রহণ বর্তমান সময়ের স্বাভাবিক ঘটনা। শিল্প প্রসারের ফলে বেকারত্ব ঘুচাতে গ্রামের অনেক দক্ষ-অদক্ষ নারী-পুরুষ নগরমুখী হচ্ছে এবং নগর জীবন গ্রহণ করছে , যা সামাজিক পরিবর্তন সাধন করছে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট হাসেম সাহেবের গ্রামে সামাজিক পরিবর্তনে যোগাযোগ , প্রযুক্তি , শিল্পায়ন ও নগরায়ণ উপাদানগুলো ক্রিয়াশীল।
ঘ) উত্তর : আমি মনে করি , উক্ত উপাদানগুলো যথা- যোগাযোগ , প্রযুক্তি , শিল্পায়ন ও নগরায়ণ সামাজিক পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়। কেননা সামাজিক পরিবর্তনে উক্ত উপাদানগুলো ছাড়া আরও বেশকিছু উপাদান রয়েছে , যা সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে এগুলো বিশ্লেষণ করা হলো- ১। প্রাকৃতিক উপাদান : বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিগত অবস্থান সামাজিক পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। ধীর এবং আকস্মিক ভৌগোলিক পরিবর্তন,জলবায়ু সংক্রান্ত পরিবর্তন , বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রভৃতি বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে এবং সমাজের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে। এদেশে নদীভাঙ্গন ,জলোচ্ছ্বাস ,বন্যা , টর্নেডো , অনাবৃষ্টি ,অতিবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন নিয়মিত ঘটনা। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করে। মানুষ এসব সমস্যা মোকাবিলায় নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করে সমাজের পরিবর্তন সাধন করে। ২। জৈবিক উপাদান : জৈবিক উপাদান সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের জৈবিক অবস্থার পরিবর্তন , যেমন- জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস ,স্থানান্তর অথবা ঘনত্বের পরিবর্তন সামাজিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩। সাংস্কৃতিক উপাদান : সংস্কৃতি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করে। যেকোন সমাজের দিকে তাকালেই দেখা যাবে বৈচিত্রপূর্ণ সংস্কৃতি, মানুষের মূল্যবোধের পার্থক্য , উদ্দেশ্য ও আদর্শের ভিন্নতা। এরই ফলে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন সংস্কৃতি লালিত প্রতিষ্ঠান, যা সমাজের মধ্যে নানা রকমের পরিবর্তন সৃষ্টি করে।
৪। শিক্ষা ঃ শিক্ষা সামাজিক পরিবর্তনের একটি বিশেষ উপাদান। শিক্ষা হলো এক ধরনের সংস্কার সাধন ও বিরামহীন প্রক্রিয়া। সমাজের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার আত্মবিশ্বাস ও বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা জাগ্রত করে। শিক্ষা যাবতীয় অজ্ঞনতা , অন্ধকার ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি দেয়। যেমন- নারী শিক্ষা প্রসারের ফলে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়েছে এবং নারীর ক্ষমতায়ন ঘটেছে ,যা সার্বিকভাবে সামাজিক পরিবর্তন সাধন করেছে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে দেখা যায়,সামাজিক পরিবর্তনের একাধিক কারণ রয়েছে। উদ্দীপকের কারণগুলো সামাজিক পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়।
