মাধব রায়, সহকারী অধ্যাপক
ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট
গতকালের পর
বিষয়টা বাঙালি সৈনিকদের সবসময় পীড়া দিতে দিতে এক সময় গা সওয়া হয়ে গেল। নূর মোহাম্মদ এই বিষয়টা অনেক আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এ থেকে কী করে মুক্ত হওয়া যায়, সেই উপায় তাঁর জানা দিল না, কারোরই জানা ছিল না।
১৯৭১ সালে বছরের শুরুতেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে। আন্দোলন, মিছিল, মিটিং, অসহযোগ, হরতাল ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। আর ছোটবেলা নাটক, যাত্রাপালা, জারিসারি, বাউল গান গেয়ে অন্তর মাটির মতো করে রাখা সংস্কৃতিকর্মী নূর মোহাম্মদএর অন্তর তো এতে দোলা দেবেই। দেশপ্রেমের মহান মন্ত্র তো সেখান থেকেই তিনি পেয়েছিলেন। ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে যথন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞে পাকসেনারা মেতে ওঠে, তখন নূর মোহাম্মদ ছুটিতে ছিলেন। নির্বিচারে বাঙালি নিধন দেখে তিনি আর স্থির থাকতে পারলেন না। আর নিজ কর্মস্থলে পাকিস্তানি অফিসার কর্তৃক বাঙালি জওয়ানদের নিগৃহীত হবার চিত্র তো তাঁর সামনে রয়েছেই। তিনি স্থির করলেন, যুদ্ধে যোগ দেবেন। অনেক দূরের পথ হেঁটে পাড়ি দিয়ে তিনি যশোরে রওয়ানা হন। ১৯৭১ এর ৫ সেপ্টেম্বর যশোরের সুতিপুরে নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য গোয়ালহাটি গ্রামে একটি টইল দল বসানো হয়। নূর মোহাম্মদ হচ্ছেন ইপিআর এর ট্রেনিং প্রাপ্ত সাহসী ও সুঠামদেহী সৈনিক। তাঁকে টইলদানের দায়িত্ব দেয়া হয়। সেই গ্রামের পাশ দিয়ে কপোতাক্ষ নদ বয়ে চলেছে এবং দুইমাইল পিছনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমানা। মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে আত্মগোপন করে এবং আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়। কয়েক মাইল দূরেই পাকবাহিনির শক্ত ঘাঁটি যশোর ক্যান্টনমেন্ট। এই গ্রামের আশেপাশে তাদের সাথে মুক্তিবাহিনির বেশ কয়েকটা সংঘর্ষ হয়ে গেছে। কাজেই এই অঞ্চলটা পাকবাহিনি এবং মুক্তিসেনা দুই দলের কাছেই কৌশলগত কারণে খুব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। সেই এলাকা এখন মুক্তিবাহিনির দখলে। পাকসেনারা চাইছে এটি পুনরুদ্ধার করে তাদের দখলে নিতে। তারা টইল দলের অবস্থান বুঝে ফেলে পাশের গ্রামের দিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকে। গোলা এবং মর্টারের শেল নিক্ষেপ করে তারা। নূর মোহাম্মদ বুঝতে পেরে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন। কিন্তু তারা তো সংখ্যায় অল্প। কাজেই কৌশল হিসেবে অবস্থান পাল্টাতে থাকেন এবং গুলি ছুঁড়তে থাকেন। অল্পক্ষণ পরেই নূর মোহাম্মদ বুঝতে পারেন এই তিনজন দিয়ে পাকসেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করা দুঃসাধ্য। তাঁরা ঠিক করেন, গুলি করতে করতে পিছু হটে অন্য দলের সাথে যোগ দেবেন। এমন সময় সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া পাকিস্তানি বাহিনির গুলিতে আহত হন। নূর মোহাম্মদ তাঁকে কাঁধে নিয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে পিছু হটতে থাকেন। কিন্তু শত্রুপক্ষের মর্টারের শেল তাঁর হাঁটুতে বিস্ফোরিত হয়ে তাঁকে চলাচলের অযোগ্য করে দেয়। আর এমনভাবে রক্তক্ষরণ হতে থাকে যে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে দুর্বল করে দেয়। নূর মোহাম্মদ দেখেন, তিনি আর বাঁচতে পারবেন না। তাঁর প্রাণের বিনিময়ে একজন সুস্থ যোদ্ধা ও অন্যজন সামান্য আহত যোদ্ধা বেঁচে থাকলে পাকবাহিনির সাথে যুদ্ধ করতে পারবে। তাঁর লাইট মেশিনগান (এলএমজি) টা শত্রুর হাতে না পড়ে ঘাঁটিতে ফেরত গেলে পরবর্তীতে মুক্তিসেনারা ব্যবহার করতে পারবে। তাই তিনি মোস্তফাকে কড়া অর্ডার দেন, নান্নু মিয়াকে নিয়ে চলে যাও। মোস্তফার সেলফলোডেড রাইফেল (এসএলআর) টা নিয়ে কাভারিং ফায়ার করতে করতে শত্রুকে ব্যস্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। কত বড় নিঃস্বার্থ আত্মবলিদান! দেশের জন্য, সহযোদ্ধা সৈনিক মুক্তিসেনার জন্য, যুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্রের জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করতে পারে কয়জন? মারাত্মক রক্তক্ষরণের মধ্যেই তিনি শত্রুপক্ষকে গোলাবর্ষণ করে আটকে রেখে মোস্তফা ও নান্নু মিয়াকে ঘাঁটিতে ফিরে যেতে পথ করে দিলেন। আস্তে আস্তে তাঁর প্রাণ চলে যাওয়া পর্যন্ত, অথবা গুলি শেষ হওয়া পর্যন্ত তাঁর এই প্রচেষ্টা চলতে থাকে। এতে শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে শহিদ হয়ে যান এই বীর। এদিকে মোস্তফার কাছে খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ফিরে এসে দেখে এই মহাপ্রাণ আর বেঁচে নেই। পিশাচ বাহিনি তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে রেখে গেছে। অন্য কোনও মুক্তিযোদ্ধাকে না পাওয়ার আক্রোশে এবং নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখে হিংস্র ক্রোধে তারা তাঁর চোখদুটোও উপড়ে তুলে ফেলেছে। পরম মমতায় মুক্তিযোদ্ধারা নূর মোহাম্মদের মৃতদেহ কাঁধে তুলে নেয় এবং কাশিমপুর সীমান্ত ফাঁড়িতে তাঁর মরদেহ দাফন করে।পরবর্তীতে তাঁর রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হলে জাতি তাঁকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে এবং সরকার তাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেয়।
