স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন কাম্য

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০১

 ‘এজন্যই কি ডাক্তার হয়েছ, নয়ন? এই জন্যই কি প্রফেসর হয়েছ? সন্তানের বয়সি একজনকে বড় মুখ করে পাঠালাম রেফার করে, লজ্জিত হতে হলো। এই জন্যই কি আমরা ডাক্তারি পড়েছিলাম বলো? দুটো কথা শুনতে চাইলে না করোনার টেস্ট ছাড়া।’ চার দিন পর যখন নেগেটিভ রিপোর্ট হাতে পেল রোগী, ডাক্তার বলল—করোনার টেস্টটি আবার করতে হবে, কারণ ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে! রোগী রেগে বলল, কেন তাকে টেস্টগুলো লিখে দেওয়ার সময়ই বলে দেওয়া হলো না যে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই আসতে হবে।

তা হলেও অবশ্য কিছু করার ছিল না। কারণ রিপোর্টটি পেতে ছেলেটির তিন দিন সময়ই লাগল। বাকিটা নরসিংদী থেকে ঢাকাতে আসতে। সে হিসেবে কুইকেস্ট পসিবল টাইমেই—সাড়ে তিন কি চার দিনের মাথায় এসেছে সে। যাহোক, একটা রফাও হলো শেষে, অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকটিই তার ব্যবস্থা করে দিলেন। জানালেন, এই টেস্ট নিয়েই রোগীকে তিনি প্রফেসর দেখিয়ে দিতে পারবেন। দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগী ছেলেটি তখন টাকা জমা দিয়ে দুদিনের গ্যাপে একটা ডেট পেল এবং টেস্টটি করাতে পারল। এরপর সার্জনের কাছে রেফার করা হলো তাকে। কোলন-সংক্রান্ত গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিক সার্জন রিপোর্ট দেখে বললেন, সার্জারির কোনো প্রয়োজন হবে না। দুটো ওষুধ লিখে দিলেন তিনি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল অপূর্ব। শেষ রক্ষা হলো যে, কোলন সার্জন তাকে বাঁচিয়ে দিলেন। চিকিত্সায় শুধু নয়, ব্যবহারে আচার-আচরণেও।

আমরা সবাই এ সমাজেরই অংশ। সিস্টেমে যখন ক্ষয় বা পচন ধরে, কোনো একটি বিশেষ ক্ষেত্রে তা না হওয়ার কারণ নেই। এদেশ এবং সমাজের প্রথম সারির একটি মেধাবী ছেলে বা মেয়ে অনেক স্বপ্ন নিয়ে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। পাঠক্রম শেষে ডাক্তার হয়ে চাকরিতেও ঢোকেন। এই ঢোকাতেই (চাকরিতে) শুরু হয় তার আশা ভঙ্গের পালা, একের পর এক। যে উদ্যম উত্সাহ নিয়ে শুরু হয়েছিল জীবন, তার রেশ ধরে রাখতে পারেন না। এই সেক্টরে—মেডিক্যাল প্রফেশনে, উচ্চতর পদের এত সংকট, নবপদ সৃষ্টি প্রক্রিয়াও এত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি যে, চাকরি, এমনকি জীবনও অনেকের শেষ হয়ে যায়, কাঙ্ক্ষিত প্রমোশন হয় না! যুগ যুগ ধরে সমাজের এই মেধাবী মানুষগুলো পড়ে থাকেন পিছিয়ে। প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ বিষয়গুলোকে আমলে নেন না। অথচ অদ্ভুতভাবে এই তারাই নিজেদের ভালো-মন্দ আয়-উন্নতির কাজগুলো মনোযোগ দিয়েই করেন। ফলে চিকিত্সক যেমন, অন্য পেশাজীবী চাকুরের ক্ষেত্রেও অনেক সময়ই একই অবস্থা ঘটে! বছরের পর বছর—এমনকি যুগও পেরিয়ে যায়, মেধাবী মানুষগুলো বুড়িয়ে যান রিটায়ারমেন্টের দিকে—পদোন্নতি হয় না। তার ওপর আছে ডিভাইড অ্যান্ড রুলের মতো ক্যাডার, নন-ক্যাডার বিভাজনের জটিল চক্র। অথচ সব প্রফেশনালদের চাকরির ক্ষেত্রে একই নিয়ম-নীতি অনুসৃত হওয়া কর্তব্য। যেমন প্রশাসন ক্যাডারে যেভাবে রিক্রুটমেন্ট হচ্ছে, প্রফেশনাল অন্য ক্যাডারের জন্য স্ব-স্ব ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগ প্রয়োজন এবং তার দায়িত্বে সিনিয়র মোস্ট প্রফেশনাল গ্রুপদের সমন্বয়ে স্ব-স্ব প্রশাসনিক বিভাগ প্রয়োজন, যাতে করে নিজ বিভাগীয় সমস্যার সমাধান তারা যৌক্তিকভাবে করতে পারেন, একমাত্র প্রশাসনিক গ্রুপের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয় না। তাতে করে পদ, প্রমোশন যথারীতি নিয়ম মতো স্বয়ংক্রিয় থাকে—যেমন প্রশাসনে থাকে।

নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে একজন সহকারী সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব হতে পারেন,  তাতে তার পদ থাকুক বা না থাকুক। প্রমোশন তো হচ্ছে। যেখানে আগে একজন যুগ্মসচিব যথেষ্ট ছিল, এখন সেই পদে একজন অতিরিক্ত সচিব থাকছেন। কারণ সময়মতো নির্দিষ্ট বিরতিতে তাদের প্রমোশন হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক—সন্দেহ নেই। সে কারণেই দেখি আমাদেরই একজন সহপাঠী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক লেভেল শেষে টেকনিক্যাল ক্যাটাগরির পরীক্ষায় পিছিয়ে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স শেষে প্রশাসন ক্যাডারে চাকরি নিয়ে আজ যুগ্মসচিব। অতিরিক্ত সচিবও হয়েছেন এক-দুজন। আবার আমাদেরই মেডিক্যাল কলেজের সহপাঠী উপজেলা পর্যায়ে সিম্পল মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করছেন ২৫ বছর ধরে! এই যে নিদারুণ ব্যবধান, এই যে অসম্মান-গ্লানি সমাজের, বলতে গেলে প্রথম সারিরই মেধাবীদের প্রতি—এর দায় কার বা কাদের ওপর বর্তায়?

ব্রিটিশ কায়দার পাকিস্তানি শাসন পেরিয়ে এই যে স্বাধীন বাংলাদেশে আছি, সংস্কারের সুযোগ আমাদের ভাগ্যে জোটেনি। পাকিস্তানি শাসকদের মতোই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ বৈষম্য করে যাচ্ছেন অন্য প্রফেশনাল গ্রুপের সঙ্গে। আশার কথা, জাতির জনকের কন্যা আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রশাসনে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ মানুষের সঠিক উন্নয়নে যেন মনোযোগী হন, কাজ করেন। শুধু নিজ গোষ্ঠী বা দলগত ভাগ্যোন্নয়নেই সময় ব্যয় না করেন। বছর বছর নিয়মমতো ঠিকই তাদের পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা যেভাবে ঘটে চলে, অন্য প্রফেশনাল গ্রুপদের ক্ষেত্রেও যেন তা হতে পারে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে পদোন্নতি বা উন্নয়নের সুযোগ অবশ্য পান প্রফেশনালদের কেউ কেউ । কিন্তু এ তো কোনো কাজের কথা নয়। দরকার সুষ্ঠু নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মেধাভিত্তিক,  জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক।

চাকরিগত সুযোগ-সুবিধা উন্নতি দিয়েই যে একজন কর্মকর্তা/কর্মচারীর কাছ থেকে যথার্থ সার্ভিস পাওয়া যায়—বিষয়টি তেমন নয়। পুরোটাই নির্ভর করে ব্যক্তির মানসিক উত্কর্ষ-বিকাশের ওপর। পরিবার, বেড়ে ওঠা শিক্ষার আলোক—এসবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই চাকরিতে নিগৃহীত বলেই যে একজন চিকিত্সকের কাছ থেকে ভালো চিকিত্সা বা মানবিক ব্যবহার পাওয়া যায় না—এ যেমন ঠিক নয়, তেমনই ব্যক্তিগতভাবে অনেক সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্ত একজন প্রফেসর বা কর্তাব্যক্তির কাছ থেকেও ভালো ব্যবহার কিংবা সার্ভিস না-ও পাওয়া যেতে পারে।

করোনাকালে স্বাস্থ্য এবং সেবা ব্যবস্থার যে চিত্র আমরা দেখি, তা সমাজের সার্বিক ব্যবস্থারই চিত্র। হেলথ সার্ভিস ডেলিভারিতে, সার্ভিস প্রদানকারী কুশীলব তথা চিকিত্সক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের অবহেলিত বা নিগৃহীত রেখে কাঙ্ক্ষিত সেবা যে অর্জন করা যায় না—এ তারই প্রমাণ। দীর্ঘ অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, বৈষ্যম্যের নিরসন করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রাণসঞ্চার করতে হবে আমাদেরকেই। রবি ঠাকুরের কবিতার লাইনগুলো এখানে একবার স্মরণে আনতে চাই—‘যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে/ পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে...।’

n লেখক :চিকিত্সক, গল্পকার