মার্কিন ইতিহাসে কলঙ্কময় দিন

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০১

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবনে ট্রাম্পসমর্থকদের সহিংস তাণ্ডবে অবাক হয়েছে গোটা বিশ্ব। এখনো যারা বিশ্ব মোড়লের স্থান দখল করে আছে, যারা বিভিন্ন দেশের বিবাদ মীমাংসা করতে কূটনৈতিক তত্পরতা চালায়, যারা রাজনীতিতে শান্তির বুলি আওড়ায় তাদের দেশে এমন ন্যক্কারজনক, হিংস  ঘটনায় বিশ্বের প্রতিটি মানুষের হূদয়ে নাড়া দিয়েছে। গণতন্ত্রের আলোকবর্তিকা খ্যাত আমেরিকার ভাবমূর্তি তো ক্ষুণ্ন হয়েছেই। সঙ্গে ভদ্র পোশাকে আমেরিকাবাসীর উগ্রবাদী আচরণও প্রকাশ পেয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প যেমন আগ্রাসি স্বভাবের, তার সমর্থকরাও ঠিক তার মতোই আচরণ করেছে। তাই তো এমন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য ট্রাম্পকেই দায়ী করেছে গণমাধ্যমগুলো। ইতিমধ্যে কংগ্রেসে তার অভিশংসনেরও দাবি উঠেছে ফের। গত বছরে ইউক্রেন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অভিশংসন থেকে ক্ষমতার বলে রক্ষা পেলেও শেষবেলায় সেই সুর আবার বেজে উঠল। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে শেষ কামড় দিলেন গণতন্ত্রের ওপর; কিন্তু তাতেও রক্ষা হলো না তার। জো বাইডেনও বলেছেন একই কথা। এর মাধ্যমে ট্রাম্প চার বছরের অর্জন ধুলোয় মিশিয়েছেন এবং আমেরিকাকেও ৫০ বছর পিছনে নিয়ে গেছেন। এই আঘাতের ক্ষত ঘুচাতে আমেরিকার অর্ধশতাব্দী পার হয়ে যাবে। ২০১৬ নির্বাচনে হেরে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন সহজেই পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন। যার ফলে পরিবেশ শান্ত রয়েছে এবং ডেমোক্র্যাটদের নমনীয় আচরণ সবার মন জয় করেছে। যার দরুন চার বছর পরেও তারা ফের ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হয়েছে; কিন্তু কী করলেন মি. ট্রাম্প! গত চার বছরে তার ভারসাম্যহীন কর্মকাণ্ডের দ্বারা নিয়মিত পত্রিকার শিরোনাম তো হয়েছেনই, নাগরিকদের মনে যুগিয়েছেন হাসির খোরাক। নির্বাচনের পর থেকেই এনেছেন কারচুপির অভিযোগ। ফল বাতিলের জন্য গিয়েছেন আদালতেও; কিন্তু কোনোটাতেই কাজ না হওয়াতে আগ্রাসি বক্তৃতা দিয়ে সমর্থকদের উত্তেজিত করে তুলেছেন। সেই ইন্ধনেই হামলা হলো ক্যাপিটল হিলের কংগ্রেস ভবনে। রচিত হলো আমেরিকার কলঙ্কিত ইতিহাস। জো বাইডেনকে অবশেষে বিজয়ী মেনে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি হলেন; কিন্তু এত নাটকীয়তা ও পার্লামেন্ট ভবনে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর কী দরকার ছিল?

ট্রাম্প যে আচরণ করেছেন তাতে আগামী চার বছর পরে রিপাবলিকান পার্টি তাকে নমিনেশন না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, ট্রাম্পের কারণে পার্টির ভাবমূর্তি আর খোয়াতে চান না দলের নেতারা। ক্ষমতা ছাড়ার পরে ট্রাম্পকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তাকে বয়কট করেছে। হোয়াইট হাউজ ত্যাগের পরে সময়ের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন তিনি। কলঙ্কের কালিতেই নিজের শেষ অধ্যায় রচনা করলেন ট্রাম্প। আমেরিকানরা যেহেতু রাজনীতিসচেতন তাই এরকম খ্যাপাটে স্বভাবের মানুষকে ফের প্রেসিডেন্টের আসনে দেখতে চাইবে না। যদিও আমেরিকার রাজনীতিতে ডলারোক্রেসির প্রভাব দিনে দিনে বেড়েই চলছে। তবুও ট্রাম্পের সম্ভাবনা ক্ষীণই থেকে যায়; কিন্তু ট্রাম্পের শেষটা খারাপের বিপরীতও হতে পারত। চার বছর ধরে যা-ই করেছেন শেষটা ভালোভাবে পার করলেও ট্রাম্পের নাম সবাই শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করত। কারণ, তার ডানপন্থি নীতির কারণে আমেরিকায় তার জনপ্রিয়তা একেবারে কম ছিল না। তা ছাড়া, চার বছরে আন্তর্জাতিকভাবে তিনি তেমন কোনো যুদ্ধের দামামা বাজাননি। যেমনটা ওবামার আমলে হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করায় যুদ্ধের আশঙ্কা হ্রাস পেয়েছিল। আমেরিকার ঘোর শত্রু ইরানকে ঘায়েল করতেই ব্যস্ত থেকেছেন বেশি।

শুরুর দিকে আরব বিশ্বকে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিতে অন্তরকোন্দলের দিকে ঠেলে দিলেও শেষের দিকে বিরোধ মীমাংসা করে ঐক্য সৃষ্টি করতে পেরেছেন। যা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় অর্জনও বলা হয়ে থাকে; কিন্তু বহির্বিশ্বে ঐক্য তৈরি কিংবা সম্পর্ক স্বাভাবিক করলেও নিজেদের দেশে সৃষ্টি করেছেন চরম অস্থিরতা। বিরোধী পক্ষের সঙ্গে কেমন আচরণ করছেন তা সবার কাছেই স্পষ্ট। যে পরিস্থিতির জন্য বিশ্বের সমকালীন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীরাও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সবাই শঙ্কায় আছেন ২০ জানুয়ারির শপথ গ্রহণ ও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অর্থাত্ শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে কি না। এখন প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্র কি পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে চলেছে? দিনদিন পৃথিবী থেকে গণতন্ত্র চর্চা লোপ পাচ্ছে এবং সেই স্থানে জায়গা করে নিচ্ছে উগ্রবাদ। উদার গণতন্ত্র (লিবারেল ডেমোক্রেসি) পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তার স্থান দখল করেছে রুদ্ধদার স্বৈরতন্ত্র (ক্লোজড অটোক্রেসি)। হাতে গোনা কয়েকটি দেশে উদার-গণতন্ত্রের সন্ধান মেলে। বেশির ভাগ দেশের নেতারা গণতন্ত্রের কথা বললেও ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে কর্তৃত্ববাদ চর্চা করেছেন। যেটাকে ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা দোআঁশলা শাষণব্যবস্থা বলা যায়। বিশ্ব জুড়ে যখন গণতন্ত্রের সংকট চরম আকার ধারণ করছে ঠিক তখনই গণতন্ত্রের মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচিত দেশটিতে ঘটল নাশকতামূলক হামলা। যেটা গণতন্ত্রের দুর্দিনের ভয়ংকর চিত্র প্রকাশ করেছে। গণতন্ত্রকে বাঁচাতে বিশ্ব জুড়ে সম্মিলিতভাবে গণতন্ত্রের চর্চা বৃদ্ধি করার বিকল্প নাই। যার নেতৃত্ব আমেরিকাকেই দিতে হবে। বিশ্ববাসীর হতাশা দূর করে গণতন্ত্রের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন জো বাইডেন—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়