আত্মহত্যা :সামাজিক দায় এবং দায়িত্ব

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০২

উত্থান-পতন, জয়-পরাজয় জীবনে থাকবেই। কিন্তু কয়জনই-বা পারে সেসব উত্থান-পতন মেনে নিয়ে পৃথিবীতে সংগ্রাম করে টিকে থাকতে? হতাশার কাছে হার মেনে এই সুন্দর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে যারা অন্ধকার জগতে পাড়ি জমান, তারা কি আসলেই স্বার্থপরের মতো সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যান, নাকি এ বিষাক্ত সমাজ থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে বেছে নেন আত্মহত্যার পথ? গবেষণায় দেখা গেছে, সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আত্মহত্যা করলেও কিশোর-কিশোরী ও যাদের বয়স ৩৫-এর নিচে তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। যারা আগামীতে নেতৃত্ব দেবে দেশকে, এগিয়ে নিয়ে যাবে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অথচ তারাই নিমজ্জিত হতাশা নামক অন্ধকারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,  প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে এবং প্রতি বছর ১০ লাখেরও অধিক মানুষ আত্মহত্যা করছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আমাদের দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৪ জন এবং বছরে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। কখনো কখনো আত্মহত্যা অঞ্চলভেদেও কম-বেশি হয়ে থাকে বলে জানান তারা। সেক্ষেত্রে ঝিনাইদহ সবার ওপরে রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর প্রায় ৩০০র অধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। এছাড়া শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে আত্মহত্যার হার ১৭ গুণ বেশি।

একজন মানুষের আত্মহত্যার পিছনে অনেকগুলো কারণ থাকলেও শিক্ষাজীবনে ভালো রেজাল্ট না হওয়া, চাকরি না পাওয়া বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার পরে বিসিএস বা সরকারি চাকরিকেন্দ্রিক হতাশা, প্রেমে ব্যর্থ, যৌতুক সমস্যা, দাম্পত্যকলহ এবং ধর্ষণ উল্লেখযোগ্য।

আত্মহত্যার বিষয়টি যতটা না মানসিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঠিক ততটাই পারিবারিক বা সামাজিক। সমাজবিজ্ঞানী, নৃ-বিজ্ঞানীদের সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মনে করেন, প্রতিটি আত্মহত্যার ঘটনা সমাজ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অবস্থার প্রতিচ্ছবি। একজন মানুষের আত্মহত্যার পিছনে আমরা পারিবারিক বা সামাজিক দায় কখনোই এড়িয়ে যেতে পারি না। একজন ছাত্র যখন পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় অথবা ভালো রেজাল্ট না করে কিংবা গ্র্যাজুয়েট শেষে চাকরি না পায়, তখন পরিবার ও সমাজ থেকে নানা কটূ কথা শুনতে হয়, শুনতে হয় উপহাসমূলক বিভিন্ন বাণী। সর্বোপরি একদিকে ভালো রেজাল্ট বা চাকরি না পাওয়া অপরদিকে পরিবার ও সমাজের মানসিক অত্যাচার তাকে হতাশায় নিমজ্জিত করে ফেলে। যার ফলে অহরহ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আবার কোনো নারী যখন যৌন হয়রানির শিকার বা যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়, তখন সমাজ ভুক্তভোগী নারীকে মানসিক সহায়তা না দিয়ে, প্রতিবাদ না করে বরং তাকেই দোষারোপ করতে থাকে এবং বিভিন্ন নেতিবাচক কথা বলে। আবার অনেকে প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ফেসবুকে যখন আবেগঘন স্ট্যাটাস দেয়, তখন তার নিজের বন্ধুগণই তাকে মানসিক সাপোর্ট না দিয়ে বরং হাসি ঠাট্টা করে। ফলে ভুক্তভোগী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। যার দরুন অহরহ আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের চারপাশে ঘটে যাচ্ছে। এ দায় কিন্তু আমরা এড়াতে পারি না।

আমরা যদি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া, ভালো রেজাল্ট না করা বা চাকরি না পাওয়া বেকার ছেলেটিকে কটূ কথা বা উপহাসের পরিবর্তে অনুপ্রেরণা দিতাম, উত্সাহ দিতাম তাহলে গল্পটা অন্যরকম হতে পারত। যৌতুক বা ধর্ষণের কারণে নির্যাতিত সে নারীর পাশে থাকতাম, মানসিক সহায়তা দিতাম তাহলে হাজারো হতাশার মধ্যেও নতুন করে বেঁচে থাকার পথ খুঁজত তারা।

জীবনে ভালো-খারাপ সময় আসবেই, সমস্যা থাকবেই। জীবনে সমস্যা রয়েছে বলেই জীবন এত সুন্দর। সমস্যা না থাকলে মানুষ নতুন করে, নতুন রূপে নিজেকে কখনো আবির্ভাব করতে পারত না। সমস্যা যেমন রয়েছে তেমনি সমস্যার সমাধানও রয়েছে। তাই জীবনকে ভালোবেসে এগিয়ে যাওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে দেখা যায়, হতাশাগ্রস্ত তরুণ-তরুণীদের মানসিক সহায়তা দিতে, তাদের অনুপ্রেরণা দিতে, নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগাতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও কাজ করে থাকে। আমাদের দেশেও এ রকম সেমিনারের আয়োজন করা উচিত। তাছাড়া, সরকারি বা বেসরকারিভাবে তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে, চাকরির পিছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে উত্সাহিত করতে হবে,  প্রণোদনা দিতে হবে।

সমাজের মানুষের ভাবা উচিত, একজন বেকার, ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা নারীকে উপহাস না করে বা নেতিবাচকভাবে না দেখে ইতিবাচক চোখে দেখতে হবে, তাদের পাশে থেকে সহযোগিতা করতে হবে। নতুন করে জীবনে পথচলার রাস্তা দেখাতে হবে। সর্বোপরি আমাদের মানসিকতা, সামাজিকতা, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক পরিবর্তনই পারে একটি সত্তার অকালে ঝরে যাওয়া রোধ করতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।