মহব্বত আলী শেখ। খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার আলাইপুর গ্রামের একজন কৃষক। এ বছর ধরে বসত বাড়ির আঙিনায় চুঁইঝালের চারা (কাটিং) উত্পাদন করে সাফল্য লাভ করেছেন। তার বাড়িতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে পলিথিনের শেডের নিচে সারি সারি সাজানো পলিব্যাগে চুঁইঝালের সবুজ চারা।
কৃষক মহব্বত আলী শেখ জানান, গত বছর করোনা মহামারির আতঙ্কে হতাশার জীবন নিয়ে বাড়িতে কর্মহীন সময় কাটছিল তার। ঐ সময় তিনি উপজেলা কৃষি অফিস থেকে চুঁইঝাল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এর কাটিং থেকে চারা উত্পাদনে উদ্বুদ্ধ হন। তারপর বাজার থেকে চুঁইঝালের লতা সংগ্রহ করে এর কাটিং (দুটি গিঁটসহ) জৈব সার ও মাটির মিশ্রণে তৈরি ছোট পলিব্যাগে রোপণ করেন। এরপর তিনি নিবিড় পরিচর্যা করেন। এতে কাটিং থেকে ধীরে ধীরে সবুজ পাতা বের হয়ে ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বসত বাড়ির আঙিনার চারশতক জমিতে তিনি প্রায় আড়াইহাজার চুঁইঝালের চারা উত্পাদন করেছেন।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত এ কাজে তার খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা। পলি ব্যাগে কাটিং রোপণের দুই থেকে আড়াই মাস পর থেকে তিনি চুঁইঝালের চারা বিক্রি শুরু করেছেন। প্রতিটি চারা ৪০ টাকা হিসেবে এ পর্যন্ত ২৫০টি চারা ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। বিক্রির অপেক্ষায় আরো প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকার চারা। তার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক কৃষক চুঁইঝালের চারা উত্পাদনে উত্সাহিত হয়েছেন। তিনি এখন চুঁইঝালের চারা উত্পাদনের একজন সফল উদ্যোক্তা।
রূপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরিদুজ্জামান জানান, চুঁইঝালের চারা উত্পাদনে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি অফিস থেকে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আলাইপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান এ চাষির পাশে থেকে নানা পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। তিনি জানান, চুঁই শিকড় থেকে কাণ্ড পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করা যায়। বাজারেও প্রতি কেজি চুঁইঝাল বর্তমানে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এখন চুঁই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। চুঁইঝাল চাষের জন্য খুব বেশি জমির প্রয়োজন হয় না। অল্পপুঁজি ও কম সময়ে অধিক লাভ হওয়ায় গত তিন বছর ধরে রূপসা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে চুঁইঝালের চাষ বেড়েছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমান জানান, চুঁইমসলা জাতীয় অর্থকরী ফসল। এর কাণ্ড, শিকড় ও শাখা-প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহূত হয়। মাছ বা যে কোনো মাংসের সঙ্গে চুঁইঝাল খাওয়া হয়। চুঁয়ের ঝাল খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, নড়াইল এবং যশোর এলাকায় চুঁইঝাল মসলা হিসেবে খুব জনপ্রিয়। তিনি বলেন, চুঁইঝালে ০.৭ ভাগ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ । এর কাণ্ড, পাতা, শিকড়, ফুল ও ফল সবই ঔষধি গুণ সম্পন্ন। চুঁইয়ের শিকড়ে রয়েছে ০.১৩-০.১৫ শতাংশ পিপারিন যা মানব দেহের জন্য উপকারী। এটি গ্যাস্ট্রিক সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। খাবারের রুচি বাড়াতে ও ক্ষুধামন্দা দূর করতে চুঁইঝাল কার্যকর ভূমিকা রাখে।
চুঁই রোপণের এক বছরের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়। তবে ভালো ফলনের পাঁচ-ছয় বছরের গাছ উত্তম। এ বয়সের একটি গাছ থেকে ১০-১৫ কেজি চুঁই পাওয়া যায়।
