পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন। ঢাকায় পাকিস্তানের পার্লামেন্টের মেজরিটি পার্টির লিডার ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর রাতের অন্ধকারে গোপনে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো ঐ রাতে ঢাকায় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছিলেন। ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে জেনারেল রাও ফরমান আলীর নেতৃত্বে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরু করা হয়। মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার নেতৃত্বে একই সময়ে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, যশোর, খুলনা, রংপুরসহ ১০টি শহরে অপারেশন সার্চলাইট শুরু করা হয়, যা ছিল ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা। অতঃপর রাত ১টা ৩০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। তিন দিন পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারকৃত অবস্থায় ঢাকা থেকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির নেতৃত্বে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাসদস্য অস্ত্রশস্ত্রসহ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল অরোরা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকারের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের অফিস থেকে ১৯ ডিসেম্বর জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে বিশেষ খামে একটি পত্র হস্তান্তর করা হয়। পত্রটি পড়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো হতবাক ও স্তম্ভিত হয়ে যান। পত্রে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, তার জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানের ফাঁসির আদেশ কার্যকর না করা। ঐ খামে আরো একটি নথি ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আদালত প্রদত্ত শেখ মুজিবুর রহমানের ফাঁসির আদেশে স্বাক্ষর করেন। ফাঁসির তারিখ ও সময় নির্ধারণ এবং কার্যকরের দায়িত্ব পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্টের ওপর অর্পণ করা হয়। শেখ মুজিবের পক্ষে লয়ালপুর মার্শাল ল কোর্টে পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজীবী এ কে ব্রোহি ডিফেন্ড করেন। ইতিমধ্যে ভুট্টো ও কমান্ডার ইন চিফ গুল হাসানের চাপে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ২০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ২৩ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির মিয়ানওয়ালি জেলের কনডেম সেল থেকে মুক্ত করে অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর নির্দেশে ২৬ ডিসেম্বর বিকালে শেখ মুজিবকে চাকলালা এয়ারপোর্টের খুব কাছে একটি রেস্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৭ ডিসেম্বর ভুট্টো শেখ মুজিবের সঙ্গে উল্লিখিত রেস্ট হাউজে সাক্ষাত্ করেন। রেডিও ও পত্রিকা থেকে বিচ্ছিন্ন বঙ্গবন্ধুকে ভুট্টো সর্বপ্রথম অবহিত করেন যে, পূর্ব পাকিস্তান এখন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। তিনি অখণ্ড পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার নিমিত্তে সমঝোতার জন্য মুজিবকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। বঙ্গবন্ধু কোনো সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর না করার ব্যাপারে অনড় ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, তিনি ঢাকায় ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত উক্ত বিষয়ে কথা বলা সম্ভব নয়। ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ খুব ভোরে রাওয়ালপিন্ডির চাকলালা এয়ারপোর্ট থেকে পিআইএর একটি বোয়িংয়ে শেখ মুজিবকে লন্ডনে পাঠানো হয়। এয়ারপোর্টে ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। বিমানটি লন্ডন হিথরো এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিংয়ের মাত্র এক ঘণ্টা আগে এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ ও যুক্তরাজ্য সরকারকে অবহিত করা হয়। হিথরো এয়ারপোর্টে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান আয়ান সাদারল্যান্ড, কমনওয়েলথের হাই অফিশিয়াল, ভারতীয় হাইকমিশনার, বাংলদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভিআইপি লাউঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হেড ওব দ্য স্টেট হিসেবে স্বাগত জানান।
শেখ মুজিব ক্লারিজ হোটেলে অবস্থান করেন। যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলসন (পরে প্রধানমন্ত্রী) হোটেলে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন এবং তিনি প্রথম শেখ মুজিবকে মিস্টার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্বোধন করেন। উক্ত হোটেলে অবস্থানের সময় বঙ্গবন্ধু বিকালে গুরুত্বপূর্ণ প্রেস কনফারেন্স করেন। অতঃপর তিনি এ রাতেই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে হেড ওব দ্য স্টেট হিসেবে স্বাগত জানান। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করা হয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ পেতে আগ্রহী। এর জন্য যুক্তরাজ্যের স্বীকৃতি বাংলাদেশের বিশেষ প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধুর ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপের কারণে ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইতালিসহ মোট ৩৭টি দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। পরে ১৮ এপ্রিল ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ করে। অতঃপর প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ৯ জানুয়ারি শেখ মুজিবকে দ্য ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের কমেট জেট বিমানে লন্ডন থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে ঢাকায় পাঠানোর সুব্যবস্থা করেন।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ কমেট জেট বিমান প্রথমে দিল্লির পালাম এয়ারপোর্টে অবতরণ করে। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। প্রায় দুই ঘণ্টা পর কমেট জেট বিমান ঢাকার উদ্দেশে পালাম বিমানবন্দর ত্যাগ করে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহানায়ক, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিকেল ৩টায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন।
ঢাকা এয়ারপোর্টে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থমন্ত্রী মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামান, প্রভাবশালী ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, সিরাজুল আলম খান, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকতা এবং প্রায় ৫ লাখ বাংলার জনতা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন।
n লেখক :প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক, জাতীয় চার নেতা পরিষদ
