ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের মধ্যকার সৃষ্ট বিরোধ আপাতত মিটছে। রাজধানীর গুলিস্তান এলাকার মার্কেটের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ নিয়ে সাবেক ও বর্তমান মেয়রের বিরোধ কয়েকদিন ধরে প্রকাশ্যে আসলেও দু’জনেরই সুর এখন কিছুটা নরম। গতকাল মঙ্গলবার থেকে পরস্পরের বিরুদ্ধে তপ্ত ও তীর্যকপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া থেকে সরে এসেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই দুই নেতা। খোকনের বিরুদ্ধে করা মানহানি মামলা প্রত্যাহার করতে আবেদনকারীদের প্রতি অনুরোধ করেছেন তাপস। আর খোকন নিরব হয়ে গেছেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলামও গতকাল বলেছেন, তাপস-খোকনের মধ্যকার মতপার্থক্য সময়ের ব্যবধানে কেটে যাবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চুয়াডাঙ্গা ও নওগাঁ জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সাঈদ খোকন ও শেখ ফজলে নূর তাপসের দায়িত্ব পালনকালে কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। জানতে পেরেছি বিষয়টি নিয়ে মামলা হোক, তা শেখ ফজলে নূর তাপস চাননি। এই মামলা প্রত্যাহার করবেন বলে আমি সংবাদ পেয়েছি। সাবেক-বর্তমান দুই মেয়রের দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে না বলেও মনে করেন মন্ত্রী তাজুল ইসলাম।
দু’জনের বিরোধ যে আপাতত মিটছে সেটি শুধু মন্ত্রী তাজুল ইসলামের বক্তব্যই আভাস দিচ্ছে না; মেয়র তাপসের বক্তব্যও সেই বার্তা দিচ্ছে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘সাকরাইন উত্সব’ উপলক্ষ্যে গতকাল দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মেয়র তাপস বলেছেন, অতি উত্সাহী কিছু ব্যক্তি আমার বিনা অনুমতিতে (সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে) মামলা করেছে, আমি আশা করব তারা এই মামলাগুলো প্রত্যাহার করবেন।
ফুলবাড়িয়া মার্কেটে সামপ্রতিক উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা গত শনিবার ঢাকায় কদম ফোয়ারার সামনে মানববন্ধন করলে তাতে যোগ দিয়ে মেয়র তাপসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। সেই মানববন্ধনে সাঈদ খোকন বলেন, ‘তাপস মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গলাবাজি করে চলেছেন। আমি তাকে বলবো- রাঘব বোয়ালের মুখে চুনোপুটির গল্প মানায় না। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়তে হলে সর্বপ্রথম নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করুন, তারপর চুনোপুটির দিকে দৃষ্টি দিন। তাপস দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের শত শত কোটি টাকা তার নিজ মালিকানাধীন ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন এবং এই শত শত কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লাভ হিসেবে গ্রহণ করছেন। অন্যদিকে অর্থের অভাবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গরিব কর্মচারীরা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাপস সিটি করপোরেশন আইনের ৯(২)(জ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়র পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন।’
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাপস সোমবার বলেছেন, খোকনের ‘মানহানিকর’ বক্তব্যের বিষয়ে তিনি ‘আইনি ব্যবস্থা’ নেবেন। সোমবারই দুই ব্যক্তি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে খোকনের বিরুদ্ধে দুটি মানহানি মামলার আবেদন করেন। মামলা দুটির আবেদন গ্রহণ করা হবে কি-না, সে বিষয়ে আদালতের আদেশ জানা যাবে ১৯ জানুয়ারি। ঢাকার মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী গতকাল এ বিষয়ে আদেশের জন্য এই তারিখ ঠিক করে দেন। কাজী আনিসুর রহমান নামে হাতিরপুলের ভুতেরগলির এক বাসিন্দা এবং মো. সারওয়ার আলম নামের এক আইনজীবী সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলার আবেদন দুটি করেন।
তাপস নিজে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছেন কি-না, গতকালের সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘আমার মনে হয় না এবিষয়ে কোনো মন্তব্যের প্রয়োজন আছে। জনগণ আসলে বিষয়টা খুব হাস্যকর হিসেবে নিয়েছে। এবিষয়ে কথা বলা সমীচীন নয়, কারণ আমি একটি দায়িত্বশীল পদে রয়েছি। অনেকে অনেক রকম মন্তব্য করতে পারেন, দায়িত্বশীল পদে যিনি থাকেন তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য আসতে পারে। সব মন্তব্য তো আর গুরুত্ব বহন করে না। সেটার প্রেক্ষিতে মন্তব্য করাও সমীচীন না।’
তাহলে কি আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মেয়র তাপস বলেন, আমি তো বলেছি যে মামলা হয়েছে তা আমি করিনি। যারা মামলা করেছেন তাদের অনুরোধ করব- এই মামলা প্রত্যাহার করেন। মানহানি যদি আমার হয়ে থাকে, তাহলে সেটা আমি পর্যালোচনা করব, ভবিষ্যতে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবিষয়ে এরপর আর কোনো প্রশ্নের উত্তর বা বক্তব্য দিতে চান না জানিয়ে মেয়র বলেন, এতে যদি আমাকে গালাগালি করা হয়, তারপরও আমি জবাব দেব না।
তাপস বলেন, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন মার্কেট থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে যে অভিযান শুরু হয়েছে তা চলবে। দুটো মার্কেটে আমরা সম্পন্ন করেছি। ভবিষ্যতে কৌশল অবলম্বন করে অন্যান্য মার্কেটেও অভিযান করব। আমরা শুধু মার্কেট না, জলাবদ্ধতা নিরসনেও কাজ করছি। এসব বিষয় নিয়ে আমরা হাস্যরসের পাত্র হতে চাই না। আমার হাতে সময় নেই। গত ছয় মাসে যে বাজেট দিয়েছিলাম আমরা, রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে পেরেছি। ৩৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এই করোনা মহামারির মাঝেও। আমরা যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যস্ত রয়েছি। আমাদের অনেক কাজ রয়েছে। আমাদের আরও কাজ করার সুযোগ দেবেন। ভুল হলে সেগুলো আমাদের দেখিয়ে দেবেন। কিন্তু এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত বিষয় নিয়ে সময়ক্ষেপণ করার সময় নেই।
সিটি করপোরেশনের টাকা সরানোর যে অভিযোগ সাবেক মেয়র খোকন করেছেন, সেবিষয়ে তাপস বলেন- মধুমতি ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর নিয়ে যে তথ্য দিয়েছেন- এটা বিভ্রান্তিকর। আমি দায়িত্বভার গ্রহণ করার আগেও মধুমতি ব্যাংকের সাথে ঢাকা দক্ষিণ সিটির ব্যবসায়িক বা সেবামূলক লেনদেন ছিল। আমানত হিসেবে দক্ষিণ সিটির অর্থ তখনও মধুমতি ব্যাংকে ছিল, এখনো আছে। সুতরাং আমি মধুমতি ব্যাংকে শুধুমাত্র একজন পরিচালক বলে এখানে কোনো অযাচিত বা দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কিছু করা হয়েছে এমনটা না। সেখানে এমন কোনো নথি দেখাতে পারবে না যে- আইন বহির্ভূতভাবে অনৈতিকভাবে কোনো কিছু করা হয়েছে। শুধু উনাকে না, সারা বাংলাদেশের সবাইকে আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম।
সংবাদ সম্মেলনে মেয়র তাপস বলেন, আমাদের অভিযানটা অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে, তার (সাঈদ খোকনের) বিরুদ্ধে না। সেই অবৈধ দখলদারদের সাথে তার কী লেনদেন হয়েছে সেটা পূর্বের বিষয়। যখন তারা কাগজপত্র দেখাতে পারেনি, আদালতের আশ্রয় নিতে পারেনি তখনই তারা সংক্ষুব্ধ হয়ে বলেছে তাদের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছিল, বলেছিল তাদের বৈধ করা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে বৈধ করা হয়নি। উল্লেখ্য, দোকান উচ্ছেদ শুরু হলে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন মালিকরা। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে খোকনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
অন্যদিকে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার আবেদন হওয়ায় গতকাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন তার সমর্থকরা। ‘ঢাকাবাসী’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে ৭০ থেকে ৮০ জন বাহাদুর শাহ পার্কে সমাবেশ করেন এবং পরে সেখানে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। সমাবেশ থেকে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে সব ‘মিথ্যা’ মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানান সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাদেক মিঠু। সমাবেশে পুরান ঢাকার আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী বলেন, এটা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। এবিষয়ে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান ও সাবেক মেয়রের পরস্পরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন ‘নিশ্চুপ’ রয়েছে কেন তা জানতে চেয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে রিজভী বলেন, সরকারের মেগা মেগা দুর্নীতির মহাসাগর থেকে ছিটেফোঁটা চিত্র দুই-একজনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এখন দুদক তামাশা দেখবে না পদক্ষেপ নেবে?
