প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব জাতিসত্তা ও ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে আইন প্রণয়ন করিয়াছে এবং এখনো করিতেছে। সেই আইনের অনুসরণ করিয়াই দেশের নাগরিকের চলাফিরা করিতে হয়। ইহার পাশাপাশি থাকে সামাজিক রীতিনীতি। তাহাও উত্সারিত হয় সমাজের মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করিয়া। ইহার ব্যত্যয় যিনি ঘটান, তিনি আইনের চোখে এবং সমাজের চোখে যথাক্রমে অপরাধী ও অসামাজিক বলিয়া বিবেচিত হন। যখন এই অপরাধী ও অসামাজিক মানুষের সংখ্যা একটি রাষ্ট্র বা সমাজে বৃদ্ধি পায়, তখন গোটা সমাজই অরাজকতায় ডুবিয়া যাইবার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাহাই বর্তমান বাংলাদেশে প্রতীয়মান হইতেছে। শুধু বাংলাদেশে নহে, পৃথিবীর সর্বত্রই বলা হয়, ‘কেহই আইনের ঊর্ধ্বে নহে।’ কিন্তু আমরা লক্ষ করিলেই দেখিব, বিশেষ করিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বে আইনই যেন পালাইয়াছে!
যশোরে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়াছে তাহার পিছনেও আছে এই ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির উপেক্ষা। পত্রিকার রিপোর্ট হইতে জানা গিয়াছে, সোমবার রাত্রি ৮টার সময় কসবায় পুরাতন কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে বসিয়া পুলিশ লাইনসের এক পুলিশ সদস্য সাদা পোশাকে এক নারীর সহিত গল্পরত ছিলেন। এই সময় ক্ষমতাসীন দলের কয়েক নেতাকর্মী সেইখানে উপস্থিত হইয়া তাহাকে জেরা করিতে থাকেন। পুলিশ সদস্য তাহার পরিচয়পত্র দেখাইবার পরও তাহাকে অদূরে লইয়া লাঞ্ছিত করা হয় বলিয়া অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তব্যরত পুলিশ আসিয়া সাময়িকভাবে নেতাকর্মীদের হেফাজতে নেয় এবং ঘটনাক্রমে কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করে বলিয়া অভিযোগ উঠে।
লক্ষণীয়, বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় রীতিনীতি রাত ৮টার সময় একজন পরপুরুষের সহিত শহিদ মিনারে বসিয়া গল্প করাটিকে স্বাভাবিক বিষয় বলিয়া গ্রহণ করে না। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ তো বটেই, এই দেশের হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও নিজস্ব ধর্মীয় ও কালচারাল নর্মগুলি অনুসরণ করিয়া থাকে। ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কোরআনে বলা হইয়াছে, ‘হে মানবসন্তান, আমি তোমাদের পোশাক দান করেছি, যেন তোমরা তোমাদের আবরু ঢাকতে পারো এবং তা-ই সৌন্দর্য। আর খোদাভীতির পোশাকই উত্তম (সুরা আরাফ, আয়াত ২৬)।’ হিন্দু ধর্মানুসারীদের জন্য ঋক্ বেদে বলা হইয়াছে, ‘যেহেতু ব্রহ্মা তোমাদের নারী করেছেন, তাই দৃষ্টিকে অবনত রাখবে, ওপরে নয়, নিজেদের পা সামনে রাখো (অধ্যায়-৮, অনুচ্ছেদ ৩৩)।’ খ্রিষ্টধর্মে নারীবিষয়ক নির্দেশাবলি প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের মতোই। সুতরাং এই সকল নির্দেশনার আলোকেই যে সমাজব্যবস্থা, সেইখানে ইহার ব্যত্যয় হইলে নানাবিধ বিপত্তি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে বহু ধর্মের মানুষ আছে। তাহাদের প্রত্যেকের যাহার যাহার ধর্ম পালন করিবার অধিকার রহিয়াছে। প্রতিটি ধর্মেই পাপ ও পুণ্যের কথা বলা হইয়াছে। প্রতিটি ধর্মেই পুরস্কারের পাশাপাশি শাস্তির বিধানও রহিয়াছে। হইাও উল্লেখ করা আবশ্যক, পশ্চিমা দেশসমূহে যতই সেক্যুলারিজমের কথা বলা হউক, যতই সংবিধান তথা রাষ্ট্র হইতে ধর্মকে পৃথক করা হউক না কেন তাহারাও ধর্মহীন হইয়া যায় নাই। বরং তাহাদের রাজনীতিতে, সামাজিক কর্মকাণ্ডে এবং ব্যক্তিগত জীবনে যথেষ্ট ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রতিফলিত হইতে দেখা যায়। যশোরের ঘটনাটি একটি উদাহরণ যে মানুষ যতই ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি হইতে সরিয়া যাইবে, ততই সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা গাড়িয়া বসিবে। তাই একটি সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা আমাদের গড়িয়া তোলা আবশ্যিক হইয়া উঠিয়াছে।
