রোমান হরফে বাংলার জগাখিচুড়ি

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৪

 ‘আপনি কামোন আছান?’ (Apni kamon achan?) রোমান হরফে বাংলায় এমন ধরনের টেক্সট মেসেজ অনেকেই পাইয়া থাকেন। রোমান হরফ ‘এ’ এবং ‘ই’-এর বিপরীতে বাংলা ‘আ-কার’ কিংবা ‘এ-কার’ অনেকের নিকটই স্পষ্ট নহে। শুরুতে যেই উদাহরণ দেওয়া হইল, তাহা তুলনামূলকভাবে বোধগম্য। কিন্তু কেহ কেহ রোমান হরফে এমন সব বাংলা মেসেজও লেখেন, যাহার মর্মার্থ উদ্ধার করিতে রীতিমতো গবেষণা করিতে হয়। এইখানে অজ্ঞতার পাশাপাশি উদাসীন, অমনোযোগী, অযত্নশীল মানসিকতা কাজ করিয়া থাকে।

বাংলাভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা অবিসংবাদিত। বাংলাভাষার তো কেবল কথ্যরূপ নহে, লেখ্যরূপও আছে বটে। সুতরাং বাংলা হরফ বাদ দিয়া রোমান হরফে হাস্যকর বাংলা লিখিবার প্রবণতা তৈরি করিয়া দেয় আধুনিক প্রযুক্তি। কীমাশ্চর্যম! পাকিস্তান আমলে আরবি কিংবা রোমান হরফে বাংলা লিখিবার প্রস্তাব দেওয়া হইয়াছিল। রোমান বা অন্য হরফে বাংলা শেখানোর জন্য কয়েকটি শিক্ষা কেন্দ্রও চালু করা হয়। এই প্রয়াস অটুট ছিল ১৯৬৪ সাল অবধি। কিন্তু শেষাবধি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এই আইয়ুবি অপচেষ্টা। অথচ ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস—আধুনিক প্রযুক্তি আসিয়া আইয়ুব খানের সেই ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনার যেন জাদুকরী বাস্তবায়ন সম্ভব করিল কিছু কিছু ক্ষেত্রে। বিশেষ করিয়া একবিংশ শতকের শুরুতে মোবাইল ফোন যখন জনপ্রিয়তা অর্জন করিতে শুরু করিল—তখন রোমান হরফে বাংলা লিখিবার বিশ্রী ব্যাপারটি সাধারণ মানুষের অস্থিমজ্জায় ঢুকিয়া গেল। আসলে, দুই দশক পূর্বে বেসিক সেলফোনে বাংলায় লিখিবার কোনো ইউনিভার্সেল ব্যবস্থাই চালু ছিল না। ভারতের আঞ্চলিক ভাষা হিসাবে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষালিপি ইউনিকোডে নিবন্ধিত হয়। ইহার পর গত এক দশকে বাংলা ফন্টের ইউনিকোড জনপ্রিয়তা পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাত ধরিয়া। এখন বাংলাদেশের প্রতিটি সেলফোনে বাংলা কী-বোর্ডের লে-আউট রাখা আবশ্যিক। কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষের পক্ষে বাংলা কী-বোর্ডের লে-আউট দিয়া ঠিকঠাক যুক্তফন্টে বাংলা লেখা সহজ নহে। এই কারণে অনেকেই রোমান ২৬টি অক্ষর দিয়াই বাংলা লিখিবার শর্টকাট পথ বাছিয়া লইয়া থাকেন। স্মার্টফোনে বিভিন্ন মেসেজিং অ্যাপ্স ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হইবার পূর্বে বেসিক ফোনে ন্যূনতম মাশুলে একটি টেক্সট এসএমএস লিখিতে হইত ১৫৯ ক্যারেকটরের ভিতরে। সুতরাং ইহার ফলে পশ্চিমা বিশ্বে ইংরেজিতে অনেক শর্টফরমের জন্ম হয়। ইহা একইসঙ্গে সময়সাশ্রয়ীও বটে। যেমন—ওএমজি (ও মাই গড), জিআর৮ (গ্রেট), ডাব্লিউ৮ (ওয়েট), ৪০৪ (আই ডোন্ট নো), লোল (লাফিং আউট লাউড), পোভ (পয়েন্ট অফ ভিউ) —এইরকম অসংখ্য শর্টফরম ইংরেজিতে চালু হয়। কিন্তু বাংলায় স্বীকৃত বা সর্বমান্য কোনো শর্টফরম নাই। যাহা আছে তাহা স্বেচ্ছাচারিতা। এবং তাহা জগাখিচুড়ি বলিয়াই সেইসব লেখার মর্মোদ্ধার করা কঠিন হইয়া পড়ে।

আইয়ুবি ইচ্ছা আমাদের আঙুলের ডগায় চাপিয়া বসিয়াছিল নিজেদের অনিচ্ছায় বা অজ্ঞতায়। প্রযুক্তিই আমাদের বাধ্য করিয়াছিল। আবার সেই প্রযুক্তিই আমাদের মুক্তিও দিয়াছে রোমান হরফে বাংলা লিখিবার বাধ্যবাধকতা হইতে। যুক্তাক্ষর লিখিতে কিছু সমস্যা এখনো বহাল থাকিলেও নব নব সংস্করণে তাহা ঠিক হইতেছে ক্রমশ। সুতরাং আমাদের উচিত হইবে বাংলা-কথা ‘বাংলা বর্ণে’ এবং কেবল ইংরেজি বাক্যে ‘রোমান’ হরফ ব্যবহার করা।