কলাবাগানে ধর্ষণের পর শিক্ষার্থী হত্যা

অভিযুক্তদের রক্ষার চেষ্টা চলছে দাবি মায়ের

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:২৮

রাজধানীর কলাবাগানে ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন নিহত শিক্ষার্থীর মা। তিনি অভিযোগ করেছেন, মূল ঘটনাকে পাশ কাটিয়ে অভিযুক্তদের রক্ষার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবে মামলাটি করতে চেয়েছি, পুলিশ সেভাবে মামলাটি নেয়নি। একটি মহল দিহান ও তার সঙ্গীদের আড়াল করার এবং আমার মেয়ের চরিত্র হননের চেষ্টা করছে। বলা হচ্ছে, আমার মেয়ের সঙ্গে দিহানের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এটি একদমই ঠিক নয়।’

গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আরো কয়েকটি দাবি জানান তিনি। এগুলো হলো—মামলার কার্যক্রম দ্রুত বিচার আইনে করা, দিহান ও তার সঙ্গীদের বিচারের আওতায় আনা, ডিএনএ পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীর পরিবার যেন কোনো অযাচিত অসুবিধার শিকার না হয়, সেই ব্যবস্থা করা।

সেদিনের ঘটনা উল্লেখ করে শিক্ষার্থীর মা বলেন, ‘গত ৭ জানুয়ারি দিহান ও তার সঙ্গীরা আমার মেয়েকে অপহরণ করে তার বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আমার মেয়েকে অমানবিক নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার পর আমাকে ফোন করা হয়। দিহান আমাকে ফোন করে জানায়, সে (শিক্ষার্থী) সেন্সলেস হয়ে গেছে। আমি হসপিটালে এসে দেখি, দিহানসহ তার তিন সঙ্গী বসে আছে। দিহান আমার পা জড়িয়ে ধরে বলে, ‘আন্টি, আমাকে বাঁচান।’ যখন আমার মেয়েকে দেখতে চাই, তখন আমাকে দেখতে যেতে দেওয়া হয়নি। কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে জানান, শিক্ষার্থী মারা গেছে। পরে দিহানের কাছে গিয়ে জিগ্যেস করি, আমার মেয়েকে তোমরা কোথায় পেলে, কেন মারা গেল? তখন সে আমাকে বলে, আমরা চার জন ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাই এবং সেখানে সে সেন্সলেস হয়ে যায়।’ তখন আবার জিগ্যেস করি, ‘বাসায় আর কোনো মেয়ে ফ্রেন্ড ছিল কি না বা তোমার বাবা-মা ছিল কি না? তখন সে বলে, না, আমরা চার জনই তাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। এরপর আমার বুঝতে বাকি থাকে না সেখানে কী হয়েছে।’

সংবাদ সম্মেলনে ঐ শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়া অথবা আমার সঙ্গে কথা না বলে সে কোথাও কিছু করত না। আমি আমার মেয়েকে এভাবে গড়ে তুলেছি। ঐ দিনও যখন সে বিপদে পড়েছে, তখন আমাকে জানাতে ফোন করেছে। আমার কষ্টের বিষয়, ঐ মুহূর্তে আমি কলটা ধরতে পারিনি। যদি সে সময় কলটি ধরতে পারতাম, তাহলে হয়তো এত বড় দুর্ঘটনা ঘটত না। আমার একটাই চাওয়া, আমি যেটা হারিয়েছি, এটা যেন আর কোনো বাবা-মা কখনো না হারান।’

মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, দিহানের এই পথে যাওয়ার পেছনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় মেনে নিতে হবে। হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘যৌন নিপীড়ন অভিযোগ সেল’ গঠন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ময়নাতদন্তে চিকিত্সক বলেছেন, শিক্ষার্থীর শরীরে ক্ষত ছিল না। কিন্তু শিক্ষার্থীর মায়ের দেখানো একটি ছবিতে দেখা গেছে, পিঠে কালশিটে দাগ রয়েছে, যা ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে—পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র শিশু-কিশোর ও তরুণদের মানসিক বিকাশের উপযোগী সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে এবং ধর্ষণ ও যৌন অপরাধের ঘটনা প্রতিরোধে পাঠ্যসূচিতে যৌন ও প্রজনন শিক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সিমা মোসলেম, ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি মাহাতাব নেছা প্রমুখ। এছাড়া নিহত শিক্ষার্থীর চার সহপাঠী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আজ বেলা ১১টায় ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।

দিহান যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধ সেবন

করেছিল কি না পরীক্ষার নির্দেশ

এদিকে এই মামলার আসামি ইফতেখার ফারদিন দিহান যৌনশক্তি বর্ধক ওষুধ ও মাদক সেবন করেছিল কি না, তা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম ইয়াসমিন আরার আদালতে এ আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) আ ফ ম আসাদুজ্জামান। পরে শুনানি শেষে আদালত তা মঞ্জুর করে। এর আগে গত ১০ জানুয়ারি ডিএনএ টেস্ট এবং জব্দ করা আলামত পরীক্ষার আবেদন করলে একই আদালত তা মঞ্জুর করে।

উল্লেখ্য, গত ৭ জানুয়ারি মাস্টারমাইন্ড স্কুলের দশম শ্রেণির ঐ শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ ওঠে। সন্ধ্যায় ধর্ষণের শিকার ঐ শিক্ষার্থীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় দিহানকে একমাত্র আসামি করে মেয়ের বাবা ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করেন। ৮ জানুয়ারি দিহান দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। বর্তমানে সে কারাগারে আছে।