উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৬

নারী হলো একজন পরিপূর্ণ মানুষ যিনি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি সবকিছুতেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। একজন নারী শুধু অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতির ধারাতেই অংশগ্রহণ করেন না, তিনি মানবশিশু জন্মদান থেকে তাকে মানব সম্পদে রূপান্তর করার এই পূর্ণ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অবদান রাখেন। জগত্ বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক নেপোলিয়ান বোনাপার্ট তাই বলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিব’। পৃথিবীতে প্রতিটি সাফল্যের পেছনে একজন নারী থাকেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে সহযোদ্ধা হিসেবে সবসময় বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছিলেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সাফল্য, বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন, বাংলাদেশকে নিম্ন আয় থেকে মধ্য ও উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় নারীর অবদান ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণকারী নারীসহ সকল নারীর অংশগ্রহণ আছে। নারী দারিদ্র্য বিমোচনের সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দারিদ্র্য বিমোচন করছে। আর এই প্রক্রিয়ায় স্বল্প শিক্ষিত নারী দুটি পদ্ধতিতে অত্যন্ত সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। প্রথমত, ক্ষুদ্র ঋণ ও দ্বিতীয়ত, গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিক হিসেবে অংশগ্রহণ। আবার বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে দুটি বিষয় নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে; ক্ষুদ্র ঋণ ও রেমিটেন্স। এই রেমিটেন্স বা বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ নারী বিদেশে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর কাজ করে প্রেরণ করে। বাংলাদেশে নারীর মুষ্টির চাল সঞ্চয়ের গল্প আসলে গল্প নয়, বাস্তব। দরিদ্র নারী তার দারিদ্র্যতার প্রতিকূলতা প্রতিরোধ করে এই মুষ্টির চাল দিয়ে। বর্তমান সরকারের ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ নামক ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের ঋণ শুধু সেই সমস্ত পরিবারকে দেওয়া হয়, যার পরিবার প্রধান হলো নারী। বাংলাদেশে এই প্রকল্প সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম একটি কারণ গার্মেন্টস শিল্প, যার মূল চালিকা শক্তিই হলো বাংলাদেশের নারী। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের মোট শ্রমিকের শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি শ্রমিক নারী, যা প্রায় ৪০ লক্ষ। বাংলাদেশের বাইরেও গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশের নারীরা কাজ করছে। যে নারী একদিন সামাজিকভাবে অবহেলিত ছিল, সে আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। আর এর প্রতিটি শ্রমিক শুধু নিজে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেনি, এর সঙ্গে একেকটি পরিবারও স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নারী এককভাবে ৪০ লক্ষ স্বাবলম্বী পরিবারের সাফল্যের দাবিদার। এই নারী শ্রমিকের সাফল্য শুধু ৪০ লক্ষ পরিবারকেই সাফল্য এনে দেয়নি, সাফল্য এনে দিয়েছে আরও বহু পরিবারকে। স্বাবলম্বী নারী শ্রমিক মজুরি বৈষম্যের জন্য আন্দোলন করছে। বাংলাদেশে নারী-পুরুষের মজুরি বৈষম্য দূর হয়েছে গার্মেন্টস সেক্টর থেকেই। একজন পেশাজীবী নারী তার সাজপোশাকের জন্য অর্থব্যয় করছে, যা একজন গ্রামীণ নারী করতে পারেন না। গার্মেন্টস শ্রমিকের কাছে সাজপোশাক বিক্রি করার জন্য আরও একটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রেণি তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ এখন সমগ্র পৃথিবীব্যাপী সম্মানের সঙ্গে স্বীকৃত। বাংলাদেশে ২০২১ সালের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ৫০ জন মনোনীত নারী প্রতিনিধি আছেন। এরমধ্যে প্রথমদিন আওয়ামী লীগের ৪৩টি পদের জন্য ৬০০ নারী মনোনয়ন ফরম কিনেছে। এই মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীরা সকলেই বলেছেন তৃণমূলের উন্নয়ন করবেন। এই নারী নেতৃত্বরা যদি তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন করেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে। তবে এই মনোনীত নারী নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে যে, আগামী ৫ বছর পর নারীরা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে যেন ৩০০টি আসনে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে।

নারী যেখানেই কাজ করে সেখানেই তাকে ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনের সঙ্গে সমন্বয়ের যুদ্ধ করতে হয়। আর এই জন্যই নারীকে ‘দেবী দুর্গা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়। নারী একই সময়ে দশটি কাজ করতে পারে। প্রতিনিয়ত তাকে গৃহস্থালির কাজ, সন্তান পালন এবং পেশাগত দায়িত্ব একই সঙ্গে পালন করতে হয়। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীর পেশাগত জীবন আজ পর্যন্ত শতভাগ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারীকে এখন পর্যন্ত শুধু সামাজিক প্রতিকূলতারই মুখোমুখি দাঁড়াতে হয় না, তাকে পারিবারিক, এমনকি বাবা-মা কর্তৃক সৃষ্ট প্রতিকূলতার মুখোমুখিও দাঁড়াতে হয়। একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশেও বেশিরভাগ বাবা-মা ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে ভেদাভেদ করে থাকেন। যেদিন বাংলাদেশের বাবা-মা ছেলে ও মেয়ে শিশুর মধ্যে ভেদাভেদ বন্ধ করবেন এবং উভয়কে মানুষ (ছেলে বা মেয়ে নয়) মনে করবেন, সেদিন বাংলাদেশের নারীর সামাজিক সমস্যা সমাধানের যাত্রা শুরু হবে। আর এর জন্য সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার।

n লেখক : অধ্যাপক ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ,

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া