শীত তার চিরচেনা রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এখন শীতের ভরা যৌবন। শীতকাল দরিদ্র-গরিব মানুষের জন্য এক অভিশাপের নাম! শীতের সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার গরিব মানুষদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয়। মূলত গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এত বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষের বিরাট একটা অংশের বিভিন্ন কারণে শীতকালে আবার কাজের সুযোগ কমে যায়। চরম মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে এসব কর্মহীন শীতার্ত মানুষ। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে থাকে। মূলত বস্তিতে ও ভাসমানভাবে বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত এসব মানুষের বাস। বাস্তবতা হলো, শীতের কবলে পড়ে ছিন্নমূল গরিব মানুষদের অনেকে এসময় মারা যায়।
এ বছর পঞ্চগড়সহ দেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক শীত অনুভূত হয়েছে এবং হচ্ছে। হাড় কাঁপানো শীতে জনজীবন জবুথবু হয়ে পড়েছে। বিশেষ কাজ ছাড়া অনেকে ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। শীতে উত্তরাঞ্চলে গরিব তথা খেটে খাওয়া মানুষেরা ‘যম’ বনে যাওয়া শীত মোকাবিলা করে ঘরের বাইরে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। শুধু উত্তরবঙ্গে নয়, খোদ রাজধানী ও দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে গৃহহীন মানুষেরা শীতের রাতে কোনো রকমে পরস্পরের উত্তাপ নিয়ে জড়াজড়ি করে নিশিযাপন করছেন। শহরের ফুটপাতে, উড়াল সড়কের নিচে, অলিতে-গলিতে, পার্ক-উদ্যানে অনেক মানুষ কোনো রকমে রাত যাপন করছেন। শীত সচ্ছল মানুষের কাছে পছন্দের ঋতু হলেও গরিব মানুষের কাছে যমদূতের সমান। কষ্ট ও ভোগান্তি ছাড়া শীত ঋতু গরিব মানুষদের আর কিছুই দিতে পারে না! তাপমাত্রার পারদ যতই নিচের দিকে নামতে থাকে ততই শ্রমজীবী মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়তে থাকে। তীব্র শীতে ঘন কুয়াশার কারণে নদীপথ, আকাশপথ ও সড়কপথে ঠিকমতো যানবাহন চলাচল করতে পারে না। অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষদের একটা বিরাট অংশ শিশু ও বৃদ্ধ। তাদের কাছে শীতকাল মানে এক আতঙ্কের নাম। এমনিতেই শীতের সময় অতিদরিদ্র এসব পরিবারে ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই নতুন এক সমস্যা। শীতের কারণে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ হূদরোগের প্রকোপ বাড়ছে। প্রতিদিনই হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে শত শত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আবার দেখা যাচ্ছে, শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে আগুন পোহাতে গিয়ে অনেকে অসাবধানতাবশত দগ্ধ হচ্ছেন।
সত্যি কথা বলতে ঋতুচক্রের গতি-প্রকৃতি আর আগের মতো নেই। আবহাওয়া দিনে দিনে চরমভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। কখনো প্রচণ্ড গরম, আবার কখনো প্রচণ্ড শীত। এই পরিবর্তনশীল আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না ছিন্নমূল-গরিব মানুষেরা। শীতে প্রকৃতি আরও রুক্ষ রূপ ধারণ করে। প্রকৃতির উদাস সুর শীতার্তদের আরও কাবু করে ফেলে। অন্যভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, শীতকালে অতিথি পাখির আগমন প্রকৃতি-পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। ভ্রমণের জন্যও উপযুক্ত সময় এই শীত ঋতু। যদিও ছিন্নমূল- মানুষের কাছে এসব মূল্যহীন! গরিব মানুষের পক্ষে খাদ্য ও স্বাভাবিক বস্ত্রের জোগান করা এমনিতেই কষ্টকর। তার ওপর আবার শীত-বস্ত্রের উষ্ণতা পাওয়া সে তো বিলাসিতা! কিন্তু অন্য সব মানুষের মতো গরিব মানুষেরও শীতের সময় সুন্দরভাবে জীবনযাপন করার অধিকার আছে। এ ব্যাপারে সামর্থ্যবান যেকোনো মানুষ ও বিভিন্ন সংস্থার উচিত শীতার্ত মানুষের পাশে এগিয়ে আসা। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেক বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যার যার অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই শীতার্ত মানুষগুলোর প্রতি। এতে শীতার্তরা একটু হলেও উষ্ণতা পাবে, ভালো থাকবে।
n লেখক:শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
