মে টিকলেন ব্রেক্সিট টিকবে?

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:২৯

 

শিফারুল শেখ

 

ব্রেক্সিট ভোটে ঐতিহাসিকভাবে হেরে গেলেও অনাস্থা ভোটে টিকে গেছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে। যে ইস্যুতে গণভোট মে’র প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ভাগ্য খুলে দিয়েছিল সেই ব্রেক্সিটই তাকে ভোগাচ্ছে। পার্লামেন্টে হেরে যাওয়ায় ব্রেক্সিটের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কোনো দলই ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারছে না। একটি গ্রুপ একটি প্রস্তাব দিলে আরেকটি গ্রুপ তার বিরোধিতা করছে। আজ সোমবার থেরেসা মে দ্বিতীয় ধাপের বা ‘প্ল্যান বি’ পেশ করবেন। তবে সেটি সবাই অনুমোদন করবে না বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। এর আগে পার্লামেন্টে ভোট এবং অনাস্থা ভোট নিয়ে করা অনুমানই সঠিক হয়েছে।

নানা মুনির নানা মত :ব্রেক্সিট নিয়ে নানা জন বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। কিন্তু একটি মতে কেউ আসতে পারছেন না। গত বুধবার আস্থা ভোটে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী মে বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপ চালাচ্ছেন। মে বুধবার রাতেই প্রধান বিরোধী লেবার দল ছাড়া বাকি দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন আলোচনায় অংশ নেননি। করবিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিটের বিকল্পের আশঙ্কা উড়িয়ে দিলেই তিনি আলোচনা করতে প্রস্তুত। কিন্তু থেরেসা মে ‘চুক্তিহীন ব্রেক্সিট’ না করার বিষয়ে আশ্বাস দিতে পারছেন না। করবিন চান ইইউ’র একক বাজার ও শুল্ক ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে থেকে যাক ব্রিটেন। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্রেক্সিটের পরও ব্রিটেন ইইউ’র আইনকানুনের বেড়াজালে কার্যত বন্দি থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন এই মতবাদের বিরোধীরা।

থেরেসা মে পড়েছেন উভয় সংকটে। করবিনের দাবি মেনে ‘সফট ব্রেক্সিট; বা ব্রেক্সিটের নরম সংস্করণের পথে এগোলে তার নিজের টোরি দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থিরা বেঁকে বসবেন। লেবার ও ক্ষমতাসীন টোরি দল পার্লামেন্টের প্রায় ৮৮ ভাগ আসন দখল করে থাকায় তাদের মধ্যে ঐকমত্য ছাড়া কোনো সমাধানসূত্র কার্যত অসম্ভব। এমন অচলাবস্থার জের ধরে ব্রিটেন আগামী ২৯ মার্চ চুক্তি ছাড়াই ইইউ ত্যাগ করতে পারে এমন আশঙ্কাই বাড়ছে। এই সময়সীমা বাড়ানো সম্ভব হলে আগাম সাধারণ নির্বাচন বা দ্বিতীয় গণভোটও আয়োজন করা যেতে পারে। করবিন গত বৃহস্পতিবার গণভোটের সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন। দ্বিতীয় গণভোটের মাধ্যমে সংকট কাটানোর প্রবক্তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। তবে এমন গণভোটে কী প্রশ্ন রাখা হবে এবং রায়ের মধ্যে ব্যবধান আগের মতো কম হলে কী করা হবে তা স্পষ্ট নয়। সরকার জানিয়েছে, গণভোট আয়োজন করতে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আজই বিকল্প সমাধানসূত্র পেশ করতে চান থেরেসা মে। খসড়া পেশ করলে সে বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হতে পারে। সংসদ সদস্যরা তাতে রদবদলের প্রস্তাব আনতে পারেন। তারপর কোনো একটি বিকল্প নিয়ে ঐকমত্য সম্ভব হলে ২৯ জানুয়ারি তা নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে। অনুমোদন হলে প্রধানমন্ত্রী মে ব্রাসেলসে গিয়ে ফের রদবদল চাইতে পারেন। ইইউ তাতে সম্মতি জানালে পরিবর্তিত চুক্তি আবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনুমোদন করাতে হবে। এত কম সময়ের মধ্যে এতগুলো পদক্ষেপ সম্ভব হবে কিনা তা নিয়েও সংশয় আছে।

কী বলছে ইইউ :ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেরেসা মে’র দ্বিতীয় প্রস্তাব মেনে নেবে কিনা তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। তবে ব্রিটেনের রাজনীতিতে চরম অনিশ্চয়তার মাঝে ইইউ একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিটের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে ইইউ। সংস্থাটি ব্রিটেনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে সংলাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস বলেন, ব্রিটেন যাতে চুক্তি ছাড়া ইইউ ত্যাগ না করে সেই লক্ষ্যে সবকিছু করা হবে। ইইউ’র প্রধান ব্রেক্সিট মধ্যস্থতাকারী মিশেল বার্নিয়ে আরো বড় আকারের ব্রেক্সিট চুক্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। কিন্তু যতদিন খোদ ব্রিটেনে কোনো একটি সমাধানসূত্র নিয়ে ঐকমত্য অর্জন করা সম্ভব না হয়, ততদিন ইইউ’র পক্ষেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। তিনি জানিয়েছেন, কয়েকটি প্রশ্নে কোনো রকম আপোষ সম্ভব নয়। তবে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী যদি কোনো স্পষ্ট সমাধানসূত্রকে ঘিরে ঐকমত্য গড়ে তুলতে সমর্থ হন, সেক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয় হতে প্রস্তুত ইইউ। প্রয়োজনে আগামী ২৯ মার্চের সময়সীমাও কিছুটা পিছাতে পারে।

মূল বিরোধ কোথায় :ইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কোন সীমান্ত চৌকি বা দেয়াল কিছুই নেই। এক দেশের লোক অবাধে যখন-যেভাবে খুশি আরেক দেশে যেতে পারে, অন্য দেশে গিয়ে কাজ করতে পারে। ব্রিটেন একটা দ্বীপপুঞ্জ। ইউরোপ ও ব্রিটেনের মধ্যে আছে সমুদ্র-ইংলিশ চ্যানেল এবং নর্থ সী। এই সাগরই সীমান্ত। কিন্তু একটি-দু’টি ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম আছে। যেমন আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড মিলে একটি আলাদা দ্বীপ। উত্তর আয়ারল্যান্ড ব্রিটেনের অংশ। আর আইরিশ প্রজাতন্ত্র একটি পৃথক দেশ এবং ইইউ’র সদস্য। এ দুয়ের মধ্যে আছে স্থল সীমান্ত। তাই ব্রেক্সিটের পর এটিই পরিণত হবে ইউরোপ আর ব্রিটেনের স্থল সীমান্তে। ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলেই এ সীমান্তে কাস্টমস চৌকি বসাতে হবে। আয়ারল্যান্ড আর উত্তর আয়ারল্যান্ডের মধ্যে যত মানুষ ও পণ্য এখন মুক্তভাবে চলাচল করে তখন তা আর থাকবে না। শত শত ট্রাক-বাসকে এখানে থামতে হবে, কাস্টমস চেকিংয়ের জন্য লাইন দিতে হবে পণ্য চলাচলে অনেক সময় ব্যয় হবে, দিতে হবে শুল্ক। এটা যাতে না হয় সেজন্যই ব্রেক্সিটের পরের জন্য মে’র পরিকল্পনায় ছিল ‘ব্যাকস্টপ’ নামে এক ব্যবস্থা। এতে বলা হয়, দুই আয়ারল্যান্ডের মধ্যে কোন ‘হার্ড বর্ডার’ বা বাস্তব সীমান্ত থাকবে না। মানুষ ও পণ্যের অবাধ চলাচল যথাসম্ভব আগের মতোই থাকবে। তবে ব্যাকস্টপ ব্যবস্থায় সেই সীমান্ত পিছিয়ে চলে যাবে আইরিশ সাগরে। অর্থাত্ উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে পণ্যবাহী ট্রাক যখন ব্রিটেনের মূলভূমিতে ঢোকার পথে সাগর পার হবে, তখন তার কাস্টমস চেকিং হবে, তার আগে নয়। অন্যদিকে ব্রিটেন থেকে যখন পণ্যবাহী ট্রাক উত্তর আয়ারল্যান্ডে যাবে, তখন সেই পণ্য ইইউ মানের সাথে সংগতিপূর্ণ কিনা তাও পরীক্ষা করাতে হবে। এর বিরোধীদের আপত্তি হলো-তাহলে তো দেশের দুই অংশের জন্য দু’রকম নিয়ম হবে। ব্রিটেন ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলেও তার অংশ উত্তর আয়ারল্যান্ড ইইউ’র আইনের কাঠামোর মধ্যেই থেকে যাচ্ছে, এটা হতে পারে না। মে বলছেন, এ ব্যবস্থা হবে সাময়িক। বিরোধীরা বলছেন, চুক্তিতে ব্যাকস্টপের কোন সীমা বেঁধে দেয়া হয়নি এবং যুক্তরাজ্য চাইলেও একতরফাভাবে বেরিয়েও যেতে পারবে না।