এম এ আলআমিন
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে উত্তেজনা চলছে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার আশু সম্ভাবনা নেই। গতবছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে একাধিকবার শুল্ক আরোপ করলে বেইজিং ও মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। যেসব মার্কিন পণ্যদ্রব্য টার্গেট করে চীন এই শুল্ক আরোপ করেছে তার মধ্যে শূকর মাংস থেকে বিভিন্ন রকম ফলমূল রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন মার্চের শেষের দিকে বিশেষ করে চীনা পণ্যের ওপর ৬ হাজার কোটি ডলার শুল্ক আরোপ করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে চীনের বিনিয়োগের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। জুলাইয়ের শুরুতে চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের শুল্ক আরোপ করে, ওই শুল্ক আরোপের ঘটনা তাত্ক্ষণিক প্রতিশোধ নিতে বেজিংয়ের পক্ষ থেকে পাল্টা শুল্ক আরোপের পথকে ত্বরান্বিত করে। বাণিজ্য ইস্যুর পাশাপাশি দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়েও দু’দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে।
অবস্থাদৃষ্টে পরিস্থিতিকে নতুন শীতল যুদ্ধ যুগের সূচনা হিসেবে কোনো কোনো বিশ্লেষক। ২০০৫ সালে দ্য আটলান্টিক সাময়িকীর প্রচ্ছদ কাহিনীতে বলা হয়েছিল চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনিবার্য। চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হয়ে উঠতে পারে রাশিয়ার চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ।‘হাউ উই উড ফাইট চায়না’ শীর্ষক ওই নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছিল ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে মূলত সাগর কেন্দি ক। ১৪ বছর আগের সেই অনুমান এখন অনেকটা বাস্তবসম্মত মনে হয়। সম্প্রতি আমেরিকা ও ব্রিটেন (১১-১৬ জানুয়ারি) প্রথমবারের মতো দক্ষিণ চীন সাগরে ড্রিল সম্পন্ন করেছে। অবস্থা মার্কিন-সোভিয়েত শীতল যুদ্ধ যুগের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের হিসাবপত্র, পেন্টসন কর্মীদের নথি থেকে শুরু করে টেক জায়ান্টদের টার্গেট করে চীনা হ্যাকাররা অনেকদিন ধরেই তত্পর রয়েছে। এ অবস্থা বছরের পর বছর ধরে চলবে বলে মনে হয়, এতে দু’দেশের সম্পর্ক আরো তিক্ত হবে। দু’দেশের মধ্যে এখন বাণিজ্য আলোচনা চলছে। হয়তো কিছুদিনের মধ্যে সমঝোতামূলক একটি চুক্তিও দেখা যাবে। দেখা যেতে পারে দু’দেশের প্রেসিডেন্ট সহাস্যে এতে সই করছেন। তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা— চীন-মার্কিন সম্পর্কে জটিলতা অনেক গভীরে চলে গেছে। বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সে রকমই মনে করেন। কারণ দু’দেশের মধ্যে যে বিরোধ কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয় বরং নীতিগত।
প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য এখন চীন-মার্কিন সম্পর্কের অন্যতম স্তম্ভ। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অনন্য ক্ষমতাধর হয়ে ওঠার একটি বড় কারণ মহাসাগরগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। চীন এই মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীকে একতরফা সুযোগ দিতে ইচ্ছুক নয়। বরং নিজের একটি প্রভাব বলয় বিস্তার করতে চায় যা দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরে বিস্তৃত হবে্। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ও পক্ষগুলো চীনের সামরিক উচ্চাভিলাষের আরেকটি কারণ। উদাহরণস্বরূপ তাইওয়ানের কথা বলা যায়। চীন কখনো চাইবে না স্বশাসিত দ্বীপটি স্বাধীনতা ঘোষণা করুক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি বলেছেন, তাইওয়ান চীনের অংশ। একে স্বাধীনতা ঘোষণা থেকে বিরত রাখতে বেইজিং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করবে। চীনের বর্তমান প্রতিরক্ষা কৌশলকে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌশক্তির প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। মহাসাগরের বিস্তৃত অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বে অনন্য শক্তিধর দেশের মর্যাদা দিয়েছে। দুটি বিশ্বযুদ্ধ ও সাবেক সোভিয়েত আমলে শীতল যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন নৌশক্তি ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখে। যুক্তরাষ্ট্র যেটি ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে শুরু করেছিল চীন তা দক্ষিণ চীন সাগর থেকে শুরু করতে চায়। তবে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ রয়েছে। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে একশ’ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র উপনিবেশ গেড়েছে, দীর্ঘমেয়াদী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়েছে। কোরিয়া যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ফিলিপাইন দখল, জাপানে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ উদাহরণগুলো তুলে ধরা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র মিত্র খুঁজেছে ও দীর্ঘমেয়াদী মৈত্রী চুক্তি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে রাশিয়ার চেয়ে চীনকে নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, কারণ দেশটি মহাসাগরের অকূল জলরাশির দিকে দৃষ্টি দিয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যেমন রয়েছে, তেমনি দেশটি এগিয়ে চলেছে প্রযুক্তির দিক থেকেও। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু চীন সহজেই মার্কিন প্রযুক্তির নাগাল পেয়ে যাচ্ছে।
