অলক বিশ্বাস
ইয়েমেন যুদ্ধের বয়স চার বছরে পা দিয়েছে। রাজধানী সানার মতো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ হুদাইদা বন্দর ও হুদাইদা শহরও এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে মরিয়া সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী। যদিও আপাতত দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্ত্রবিরতি চলছে। কিন্তু এই চার বছর ধরে চলা ক্ষমতার লড়াইয়ে যা হবার হয়ে গেছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে চরম মূল্য দিয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। ইয়েমেনের লাখ লাখ মানুষ একদিকে যেমন পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছে, প্রাণ দিয়েছে, তেমনই কোটি মানুষ গৃহহীন হয়েছে, অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। এমন বাস্তবতার মধ্যে শিশুদের লেখাপড়ার মতো বিষয় হয়ত অনেকের কাছেই তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে না-ও হতে পারে। আতঙ্কের কথা এই যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের লাখো শিশুর শৈশব হারিয়ে গেছে ভয়ঙ্কর চোরাবালিতে।
যুদ্ধের কারণে রাজধানী সানাসহ দেশটির অনেক জায়গার স্কুল ভবনগুলো পুরোপুরি পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেছে কোমলমতি শিশুদের। কোথাও কোথাও স্কুলঘরগুলো ব্যবহূত হচ্ছে গৃহহীন মানুষের থাকার ক্যাম্প হিসেবে। হুদাইদা থেকে গত ছয় মাসে সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষ অন্যত্র পালিয়ে গেছে। ৯ বছরের আহমেদ কিছু দিন আগেও হুদাইদার একটি স্কুলে পড়ালেখা করত। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে লেখাপড়া, খেলাধুলার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছিল তার মতো অনেক শিশু। কিন্তু জুনে হুদাইদায় যুদ্ধ শুরু হলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন সারাদিনই ছুটি। অবসর বলতে কিছু নেই, বরং বলা যায় সারা দিনই তার অবসর। আগে স্কুলে বিরতিতে খেলাধুলা করে দারুণ লাগত। কিন্তু এখন সারাদিনই অবসর। খেলার অনেক সময় থাকলেও নেই খেলার মতো পরিবেশ। তার মতো অনেক শিশু ক্যাম্প হয়ে ওঠা পরিত্যক্ত স্কুল ভবনে নোংরা পরিবেশে সারাদিন খেলাধুলা করে সময় অতিবাহিত করছে। এভাবেই চুরি হয়ে যাচ্ছে ইয়েমেনের শিশুদের শৈশব।
কিছুদিন আগে সেভ দ্য চিলড্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে এখন মোট ৫২ লাখ শিশু দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। নতুন করে আরও ১০ লাখ শিশু দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে আছে। যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকা খাদ্যমূল্য ও ইয়েমেনি মুদ্রার অব্যাহত দরপতনে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকির মধ্যে পড়া পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। লাখ লাখ শিশু জানে না পরবর্তী খাবারটি কখন পাবে অথবা আদৌ পাবে কিনা। চলতি বছর শেষ হওয়ার আগেই ৩৬ লাখেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
ইয়েমেনি শিশুদের পুরো একটি প্রজন্ম এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এই যুদ্ধের মাধ্যমে যেভাবে শিশুদের শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে তেমনইভাবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যুব সম্প্রদায় ইস্যুতে খুবই বড় বিপদের মুখোমুখি হবে দেশটি। কারণ আজকের এই শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত্। কিন্তু এই শিশুদের একটি বড় অংশই আজ পর্যাপ্ত খাবার, চিকিত্সা, শিক্ষা কিংবা চিত্তবিনোদনের মতো মৌলিক চাহিদা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
