দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় বিধ্বস্ত অ্যাসাঞ্জ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ২২:৩০

শাহবুদ্দিন ভূইয়া

 

স্তেফানিয়া মাওরিজি ইতালির একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। উইকিলিক্স প্রকাশনায় কাজ করেছেন। তিনি একজন সুলেখিকাও বটে। দ্য ডেইলি স্টারের ইরেশ ওমর জামাল উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসানজের লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে থাকা সম্পর্কে মাওরিজির একটি সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। সেটির কিছু অংশ তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন:সম্প্রতি আপনি লন্ডনে ইকুয়েডর দূতাবাসে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাথে সাক্ষাত্ করতে পেরেছেন। তার বর্তমান অবস্থা কি?

জবাব: আট মাসের ব্যর্থ চেষ্টার পর ১৯ নভেম্বর তার সাথে দেখা করতে পারি। কারণ গত মার্চে ইকুয়েডর কর্তৃপক্ষ তার সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শুধু তার আইনজীবীরা ছিলেন ব্যতিক্রম। আট মাসে আমি নয়বার তার সাক্ষাত্ প্রার্থনা করি। কিন্তু ইকুয়েডর কোনো জবাব পর্যন্ত দেয়নি। শেষ পর্যন্ত অনুমতি পেয়ে উইকিলিক্স প্রতিষ্ঠাতাকে দেখতে পাই। দীর্ঘ নিঃসঙ্গতায় তার শরীর বিধ্বস্ত। আমি তার এবং তার প্রতিষ্ঠান উইকিলিকেসর মিডিয়া পার্টনার হিসাবে গত নয় বছর কাজ করেছি। তবে দুই ঘণ্টা কথা বলে বুঝতে পারি, তিনি ভালো আছেন। সাড়ে ছ’ বছর লাগাতার আটক থাকার পরও তার মাথা কাজ করছে দেখে অবাক হই। আমারতো ছয় বছর লাগতো না, ছয় মাসেই পাগল হয়ে যেতাম। আবদ্ধ নিঃসঙ্গতা তাকে শেষ করে দিচ্ছে এবং কেউ কিছু করছে না। ছোট্ট কুঠুরি, সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছে না। মেডিক্যাল সুবিধা নেই। এই ট্রাজেডি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।

প্রশ্ন:বছরের পর বছর ইকুয়েডর সরকার সাহসিকতার সাথে অ্যাসাঞ্জকে রক্ষা করেছেন। হঠাত্ কি এমন ঘটলো যে, গত মার্চে তারা বাইরের সাথে তার সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেন? এই ইউটার্নের কারণ কি?

জবাব: ইকুয়েডরে রাজনীতির পুরো পরিবর্তন ঘটেছে। পরিবর্তন হয়েছে পুরো ল্যাটিন আমেরিকারও। ২০১২ সালে ইকুয়েডর অ্যাসাঞ্জকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করে। সেই সময় থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনোর আমলে আমি কখনও অ্যাসাঞ্জের সাক্ষাত্ পাইনি। মোরেনোর ঘোষিত নীতি অনুসারে এটা পরিষ্কার যে, অ্যাসানজ কিংবা উইকিলিকেসর কাজ তার পছন্দ নয়। শত সমস্যা সত্ত্বেও ইকুয়েডরের সাবেক প্রেসিডেন্ট রাফায়েল কোরেরা তাকে রক্ষা করেছেন, যেখানে মোরেনো তাকে অনর্থক বোঝা বলে মনে করেন। মোরেনো ইকুয়েডরের ডানপন্থী রাজনীতিকদের চাপে আছেন, আরও চাপ আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মতো শক্তিশালী সরকারগুলোর যারা অ্যাসানজকে এবং উইকিলিক্সকে ধ্বংস করার সামান্যতম সুযোগও হাতছাড়া করবে না।

প্রশ্ন:অ্যাসাঞ্জে প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন, বেশিদিনের কথা নয়। গত নভেম্বরে মার্কিন বিচার বিভাগ দুর্ঘটনাবশত প্রকাশ করে ফেলে যে, তাকে যুক্তরাষ্ট্রে গোপনে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এরপরই দূতাবাস থেকে তার বের হওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জবাব:গোপন অভিযোগটি বিমুক্ত (ডিক্লাসিফাই) না হওয়া পর্যন্ত এটা বলা মুশকিল। মার্কিন সংস্থা রিপোর্টার্স কমিটি ফর ফ্রীডম অব দ্য প্রেস, ভারজিনিয়ার ইষ্টার্ন ডিসট্রিক্ট কোর্টে এটি বিমুক্ত করার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তাদের প্রশংসা করি। মার্কিন কর্তৃপক্ষ সবসময়ই তাকে উইকিলিক্স প্রকাশনার কারণে অভিযুক্ত করতে চেয়েছে সেই ১৯১৩ সাল থেকেই যখন উইকিলিকস আতে ঘা-লাগা রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। তবে সেদিন যুক্তরাষ্ট্র তা করতে পারেনি। পারেনি, প্রথম সংশোধনীযুক্ত শাসনতান্ত্রিক সুরক্ষা পেয়ে আসছে উইকিলিক্স, এজন্য। এখন দেখতে হবে কি করে তারা এই সুরক্ষা ভেদ করে অ্যাসানজকে এবং অন্যান্য উইকিলিক্স সাংবাদিকদের জেলে পুরতে পারে!

প্রশ্ন: অ্যাসাঞ্জকে ওরা কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারলে অন্যান্য প্রকাশনা এবং বিশ্বে সাংবাদিকদের স্বাধীনতার ওপর তার কতোখানি প্রভাব পড়বে?

জবাব:বিশাল। এজন্যই আমেরিকান সিভিল লিবারটিজ ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলো মুখ খুলেছে  জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে কখনো কোনো সম্পাদক কিংবা গণমাধ্যম কারারুদ্ধ হয়নি। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কিংবা উইকিলিকসের কোনো স্টাফের জেল হলে তা হবে মার্কিন ইতিহাসের প্রথম এবং সেদেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানার বিধ্বংসী দৃষ্টান্ত। প্রেস এবং সাংবাদিকদের জন্য যে দেশে শাসনতান্ত্রিক রক্ষাকবচ রয়েছে সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই যদি এমনটি ঘটে তাহলে অন্যান্য দেশে যেখানে এরূপ রক্ষাকবচ নেই তারা যে কি করবে সহজেই বুঝতে পারো। যুক্তরাষ্ট্র সকলের কাছে এই বার্তাই পাঠাবে: ‘ধরো ব্যাটাদের’।