শীতের বুড়ি, বুড়িমা ও আর্যর গল্প

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:৩২

সন্ধ্যা নামে। জেঁকে বসে শীত। বাইরে হিমেল হাওয়া। এই সময়টা ভীষণ পছন্দ আর্যর। বাবা কোত্থেকে যেন খেজুরের রস জোগাড় করেন। খেজুরের রস খেতে খুব ভালো লাগে। মা হরেক পদের পিঠা বানান। পাটিসাপটা, পুলি, চিতই, দুধচিতই, পাকোয়ান, নকশি, ক্ষীর পিঠা আরো কত পদের পিঠাপুলি! বাহারি সব নাম। একেক পিঠার একেক রকম স্বাদ। মজাই আলাদা। প্রতি বছর কাছের বন্ধুদের নেমন্তন্ন করে। এ সময়টায় পড়ার চাপ থাকে না। পিঠাপুলির উত্সব তাই বেশ জমে ওঠে।

শীতের শুরুতেই নতুন পোশাক কিনে দেন বাবা। গরম পোশাক। শুধু আর্য নয়, কেনা হয় বাড়ির সবার জন্য। সোয়েটার, জ্যাকেট, হুডি, কানটুপি। আরো কত কী! চাচা-মামা-খালামণিদের পক্ষ থেকেও থাকে শীতের কাপড়। সবমিলিয়ে কয়েক সেট হয়ে যায়।

সন্ধ্যা নেমেছে একটু আগে। কম্বল মুড়ি দিয়ে গল্পের বই পড়ছিল আর্য। বাবার গলা শুনতে পেল। অফিস থেকে প্রতিদিন এসময়ে ফেরেন তিনি। এগিয়ে যেতেই দেখল, সঙ্গে দুটি নতুন কম্বল। এর একটি ছোট, আর্যর জন্য। প্রতি শীতে নতুন কম্বল কেনেন তিনি। প্রতি বছর কেন নতুন কম্বল কিনতে হবে! ভেবে পায় না, আর্য। এ নিয়ে বাবাকে জিজ্ঞাসা করা হয় না কোনোদিন। ধরে নেয় এটিই নিয়ম।

অনেক বড়ো বাড়ি আর্যদের। কয়েকটি কক্ষ ফাঁকা পড়ে থাকে। হাতেগোনা চার জন মানুষ। মা, বাবা, দাদিমা আর আর্য। দাদিমা ওদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। আর্যরা ছাড়া তার কাছের কেউ নেই। তাকে ছোট্টটি থেকেই দেখে আসছে আর্য। তার কাছেই বড়ো হয়েছে ও। আর্য ডাকে বুড়িমা। রাজ্যের গল্প তার ঝুলিতে। আর্য যখন আরো ছোট, গল্প শোনাতেন আর খাবার খাইয়ে দিতেন। গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। এখনো গল্প শোনান।

একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে আর্য। এখন গল্পের বই পড়ে নিজে নিজেই। তাই গল্পের আবদার খুব একটা করে না।

পড়ার টেবিলে বসে নতুন বছরের নতুন বই দেখছিল আর্য। নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতেও ভালো লাগে। এমন সময় কক্ষে এলেন বুড়িমা। সঙ্গে পিঠাপুলি। পাশে এসে বসলেন। ‘একটি গল্প বলো, বুড়িমা। অনেকদিন তোমার কাছে গল্প শোনা হয় না।’ আর্যর কণ্ঠে আবদার।

‘এখন তুমি বড়ো হচ্ছো। বুঝতে শিখছো। এবার একটি সত্যিকারের গল্প বলব। যদি শুনতে চাও।’ বললেন বুড়িমা।

‘অবশ্যই শুনব। বলো বুড়িমা।’

‘তার আগে বলো, ষড়ঋতুর একটি শীত, এই ঋতু তোমার কেমন লাগে?’ প্রশ্ন বুড়িমার।

‘ভী-ষ-ণ ভালো লাগে’ ঝটপট জবাব আর্যর।

‘কিন্তু এটা কি জানো, শীত এলে কিছু মানুষের অনেক কষ্ট হয়।’ খানিকটা থেমে বলেন বুড়িমা। ‘নীল পরি, লাল পরি, রাজকুমার, রাজকুমারীদের গল্প শুনেছ এতদিন। আজ দুখী মানুষের গল্প বলব। অনেক মানুষ আছে, শীতের পোশাক কিনতে পারে না। কেউ শ্রমজীবী। কেউ শিশু। কেউ বৃদ্ধ। চৌরাস্তার মোড়ে দেখবে একজন বয়স্ক মহিলা। হাতে লাঠি। শীতে ঠকঠক কাঁপে। শীতের বুড়ি বলতে পারো। এরকম অনেকেই আছে। শীতের কাপড় নেই। এই শহরে এসেছে দু মুঠো খাবার জোটাতে। অনেকের ঘর নেই, আশ্রয় নেই। ঘুমায় খোলা আকাশের নিচে। শীতে নির্ঘুম রাত কাটে।’

দাদিমার কথা শুনে ভীষণ মন খারাপ হয় আর্যর। শীতের বুড়ির কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন সকাল হতেই হাজির আর্যর বন্ধুরা। ওদের পিঠাপুলির নেমন্তন্ন করা হয়েছে। মা একেক পদের পিঠা দিয়ে যাচ্ছেন। সবাই খাচ্ছে খুব আয়েস করে। খাওয়ার ফাঁকে শীতে কষ্ট করা মানুষদের প্রসঙ্গ তুলল আর্য। বলল, ‘আমাদের বাড়িতে অনেক কম্বল পড়ে আছে। অনেক সোয়েটার বের করা হয় না কোনোদিন। এসব পোশাক পেলে ওদের কষ্ট থাকবে না। আমি ঠিক করেছি, এগুলো ওদের উপহার দেবো।’

‘আমাদের বাড়িতেও অনেক শীতের পোশাক পড়ে আছে। বাড়তি পোশাক আমাদের কোনো কাজে আসে না। ওরা পেলে অনেক খুশি হবে।’ বলল বর্ণ।

‘আমিও তোদের সঙ্গে থাকতে চাই।’ বলল আনন্দ।

সায় দিল অন্যরাও। আর্যর বাবা একটি জরুরি কাজে তখন বাইরে। মা ওদের কথা শুনে খুব খুশি হলেন। ঠিক হলো, সবাই বাড়তি পোশাক জড়ো করবে আর্যদের বাড়িতে। সবাই মিলে শীতে কষ্টে থাকা মানুষদের উপহার দেবে। একটু পরে বাড়ি ফিরলেন আর্যর বাবা। সবার কথা শুনে তিনি ভীষণ খুশি হলেন। ঘোষণা দিলেন, এই মহত্ কাজে এক ডজন কম্বল ও ২০টি সোয়েটার কিনে দেবেন এবং সেটা আজই।

আর্য বলল, ‘তাহলে আর দেরি কেন? শীতের বুড়ির কথা বলেছিলেন বুড়িমা। তাকে দিয়েই শুরু করা যাক!’