তালেব রানা
ভারতে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিশাল জয় পেয়েছিল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই জয়ের পর একটা বিষয় জোরেশোরে উচ্চারিত হতে থাকে যে, এটা ‘মোদী ম্যাজিক’। নরেন্দ্র মোদীর কারণেই ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ওই নির্বাচনের পর আবারো নির্বাচন হতে যাচ্ছে। পাঁচ বছর পরও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন নরেন্দ্র মোদী। বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিযোগিতায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এই বিষয়টি নরেন্দ্র মোদীকে অনেকটা স্বস্তি দিয়েছে। বিজেপি বিরোধীদের কটাক্ষ করে আসছে যে, বিরোধীদের প্রধানমন্ত্রী পদে কে বসবেন! তবে বিরোধীরাও বসে নেই। নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলো বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একজোট হয়ে মাঠে নামছে। এক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য নির্বাচনে বিজেপিকে পরাজিত করা। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নির্বাচনের পরই নির্ধারণ করা হবে।
চলতি বছরের এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে ভারতের লোকসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই রাজনীতির মাঠ গরম করে তুলেছে বিরোধীরা। গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় বলা চলে বসেছিল বিজেপি-বিরোধী দলগুলোর নেতাদের হাট। যেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ডাকা ঐ জনসভায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, নানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, শক্তিশালী নেতাসহ ভারতের ২০টির বেশি বিরোধী দলের নেতারা হাজির হয়েছিলেন। এমনকি হাজির ছিলেন, বিজেপির বিদ্রোহী তিন নেতা- প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিনহা, অরুণ শৌরি আর এখনো বিজেপিতেই থাকা অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা।
এই জনসভার বিষয়ে ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভাশিষ মৈত্র বিবিসিকে বলেন, এর আগেও জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে কংগ্রেস বিরোধী নেতাদের কনক্লেভ হয়েছে কলকাতায়। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এতজন শীর্ষ বিরোধী দলীয় নেতা কোনো সভায় একসাথে হাজির হয়েছেন, একটিমাত্র এজেন্ডাকে সামনে রেখে, এ ইতিহাস বোধহয় নেই। দেশের এমন কোনো প্রান্ত নেই, যেখান থেকে বিজেপি বিরোধী আঞ্চলিক দলের নেতারা হাজির হননি।
সভার শুরুর দিকে ভাষণ দেন যশবন্ত সিনহা। তিনি বলেন, সব শীর্ষ নেতাদের একটা বিষয় নিশ্চিত করতে হবে, ভারতীয় জনতা পার্টির বিরুদ্ধে একজনই মাত্র প্রার্থী লড়াই করবেন। একের বিরুদ্ধে এক, এভাবে যদি লড়াই হয়, তাহলে বিজেপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। কংগ্রেসের সংসদ সদস্য অভিষেক মনু সিংভি বলেন, সাম্প্র্রতিক যে কোনো নির্বাচনের ফলাফল দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে ভোট ভাগাভাগির একমাত্র ফায়দা নিয়েছে বিজেপি। এই বহুদলীয় মঞ্চে হাজির সব নেতা-নেত্রীদের এটা নিশ্চিত করতে হবে যে বিরোধী ভোট যাতে ভাগ না হয়। যেখানে ভোট ভাগ হয়নি, সেখানেই বিজেপি পরাস্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেলেও বিজেপির আসন সংখ্যা ছিল তিনশ’রও বেশি। বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ভোট ভাগাভাগির সুযোগেই বিজেপি বহু আসনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পেরেছিল।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারতের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশে জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দুই চির প্রতিপক্ষ দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপি)। নরেন্দ্র মোদীকে হারাতেই দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে জোট গড়েছেন এসপি’র অখিলেশ যাদব ও বিএসপি’র মায়াবতী। তারা দু’জনই উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। মায়াবতীর মতে, এই জোট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপি প্রধান অমিত শাহের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দাবি মিথ্যা নয়। কারণ রাজ্যে বিজেপির ভোট ৪০ শতাংশ আর এসপি ও বিএসপির মোট ভোট ৪৪ শতাংশ। এই জোটের দাপটে বেশ কিছু আসন হারাতে হতে পারে বিজেপিকে। কলকাতার সমাবেশে হাজির হয়েছিলেন অখিলেশ যাদবও।
কিন্তু সব রাজ্যেই যে একইভাবে বিজেপি বিরোধী দলগুলো জোট করতে পারবে, এমন সম্ভাবনা এখনো নেই। সেসব রাজ্যের মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গও। এখানে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস, তাই রাজ্য কংগ্রেসের নেতারা শনিবারের সভা থেকে দূরে ছিলেন। আর বামফ্রন্ট সভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেনি।
কিন্তু দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেটা কলকাতার সভায় অনেক নেতা মনে করিয়ে দেন। ভারত শাসিত কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে নেতাদের। কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটা পরে দেখা যাবে। সমাবেশে বিরোধী দলগুলোও ঘোষণা করেছে যে, নিজ নিজ রাজ্যেও বিজেপি বিরোধী সমাবেশ তারা করবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই একটা সমাবেশ সব কিছু হয়ে যাবে না। ঐক্যও তৈরি হবে না। কিন্তু এখানে বিজেপি বিরোধী একটি ‘স্পিরিট’ লক্ষ্য করা গেছে। বিরোধীদের লক্ষ্য বিজেপিকে হারানো, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন সেটা নয়। এটিই বিজেপির জন্য একটি বড় বার্তা।
